হাতের কাছে বেড়াতে যেতে ঐতিহাসিক মূর্শিদাবাদের (Murshidabad) জবাব নেই। পেশাদার জীবনের চরম ব্যস্ততার মাঝে হুট করে মূর্শিদাবাদের উদ্দেশ্য বেরিয়ে পড়াই যায়। একঘেয়েমি দূর করতে দু –এক দিনের ফ্যামিলি ট্যুর অথবা বন্ধুরা মিলে দল বেঁধে ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়া। কারন কথায় আছে ‘ভ্রমন পাগল বাঙ্গালি’। মন্দ কি! স্বল্প খরচে পকেট বাঁচিয়ে মাত্র ছ’শো টাকা খরচ করে যদি ঘুরে আসা যায় ঐতিহাসিক এই শহর!

যার মাটির ঘ্রানে এখনও নীরবে মিশে আছে ইতিহাসের সকরুন সত্য। এমনভাবেই অসংখ্য মানুষের  জীবনের বলিদান রয়েছে, যাতে লাভ-লোকসানের হিসেব নেই। হাজারদুয়ারী (Hajarduari) থেকে রাজবাড়ি শহরটির কোনে কোনে ইতিহাসের নিষ্ঠুর স্বরলিপি লেখা রয়েছে। ইতিহাসের হাতছানি থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারেনি ভবিষ্যত প্রজন্ম। স্মৃতি সততই সুখের নয়। যেমন কলকাতার অদূরে এই শহর মূর্শিদাবাদ (Murshidabad)।  

সকালে কলকাতা স্টেশন থেকে সকাল ৬.৫০ হাজারদুয়ারী এক্সপ্রেস মূর্শিদাবাদ পৌছে যায় সাড়ে দশটায়। এছাড়াও রাত সাড়ে এগারোটায় শিয়ালদা থেকে ছাড়ে লালগোলা এক্সপ্রেস। ভোর চারটের  মধ্যে নামিয়ে দেয় মূর্শিদাবাদে (Murshidabad)। রয়েছে আরও অন্যান্য ট্রেন। বাসে করেও আপনি সরাসরি মূর্শিদাবাদ যেতে পারেন।

এই শহরের কোথায় ঘুরবেন? এর মধ্যে পনেরোটি  জায়গা খুবই  নজরকাড়া। হাজারদুয়ারী, কাটরা মসজিদ, কাঠগোলা প্যালেস, কাঠগোলা মন্দির, জগত শেঠের বাড়ি, মূর্শিদাবাদ রাজবাড়ি, নাসেরপুর রাজবাড়ি, কোশ বাগ, আজিমুনিশা বেগম সমাধি, ইমামবাড়া, বাচাওয়ালি তোপ, ক্লক টাওয়ার, হলুদ মসজিদ, মতিঝিল, জাহান কোশা কানন, মিরজাফর ও তাঁর পরিবারের সলিল সমাধি। 

এই জায়গাগুলি ঘুরে দেখলে পশ্চিমবঙ্গের মোঘল সাম্রাজ্যের নবাবি আদব কায়দা থেকে তাঁদের উত্থান ও পতনের নানা স্মৃতি, যা ঐতিহাসিক এই শহরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। যা আপনাকে প্রতি মুহূর্তে উদাস করে দেবে। রাজবাড়ির ঘরে-বাইরে উলঙ্গ ‘রাজ শিশু’দের ধুলোমাখা মলিন চেহারায় ঘুরে বেড়াতে দেখেও আপনার  কষ্ট হতে পারে।  

নবাবিয়ানা না  থাকলেও  মুর্শিদাবাদে (Murshidabad) ঘোড়ার গাড়িতে চলার রেওয়াজ রয়েই গেছে। মুর্শিদাবাদ স্টেশনে নেমে হামেশাই রিক্সা কিংবা ঘোড়ার গাড়ি জন প্রতি দশ টাকা ভাড়ায় হাজারদুয়ারী  যাওয়া যায়। প্রতি গন্তব্য পিছু পৃথক ভাড়া লাগে। মিউজিয়ামে ঢুকতে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য পচিঁশ টাকা  টিকিট লাগে। কাঊন্টারে মানি পার্স, মোবাইল জমা রেখে ঢুকতে হয়। এই দ্রষ্টব্য স্থানটি প্রতি শুক্রবার  বন্ধ থাকে।

১৮৩৪ সালে নবাবরা ঐতিহাসিক হাজারদুয়ারী (Hajarduari) তৈরি করেছিলেন, যার রক্ষনাবেক্ষন এখনও একইভাবে চলছে। কোনও এক সময় বাংলা, বিহার ও ওড়িশার রাজধানী ছিল এই মুর্শিদাবাদ (Murshidabad)। নবাবি শহর হলেও ইতিহাসের থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, সব নবাবই ব্রিটিশের অধীনে থেকে কাজ করেছেন। হাজারদুয়ারির স্থাপত্য শিল্প রোমান স্থাপত্যর অনুকরণে তৈরি হয়েছে। শহর ঘুরে দেখতে বুঝতে গাইডের সাহায্য নিতে পারেন। যাঁরা সদা সর্বদা আপনার সেবায় প্রস্তুত। ব্রিটিশ ও নবাবদের কারুকার্য ও স্থাপত্য বুঝিয়ে দিতে ওঁরা সাহায্য করেন।

যাতে নবাবরা সেইসময় যে ব্রিটিশদের অধীনে ছিল তা স্পষ্ট বোঝা যাবে। হাজারদুয়ারীর ছত্রে ছত্রে ইতিহাসের ছোঁয়া। মিউজিয়ামে অস্ত্র, হাতির দাঁতের কাজ, আয়না, ভিক্টোরিয়ার দেওয়া ঝাড়বাতি।  আবুল ফজলের লেখা আইনি- আকবরী। উল্টোদিকে নিজামুদ্দিনের ইমামবাড়া। এখানে একটি কামান  আছে, যার নাম বাচ্চেওয়ালি তোপ। এই হাজারদুয়ারীর (hajarduari) আশেপাশে ছোট ছোট খাবারের দোকান আছে। সেখান থেকে পেট পুজো সেরে ফের পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়া।

মূর্শিদাবাদে (Murshidabad) পর্যটকদের থাকার জায়গার অভাব নেই। এরমধ্যে হাজারদুয়ারির কাছাকাছি অনেক হোটেল আছে। তবে ভাগীরথীর তীরে হোটেল মঞ্জুষা থাকার জন্য বেশ সুন্দর জায়গা। একটি পারিবারিক হোটেল।

৭০০ টাকা একদিনের ভাড়া। কম খরচে থাকার জন্য আছে ইয়ুথ হোস্টেল। পশ্চিমবঙ্গ উন্নয়ন নিগমের  গেস্ট হাউস। স্থানীয়  কেনাকাটার জন্য রয়েছে লোকাল মার্কেট। এদিক–ওদিক ঘুরতে শহর জুড়ে ছুটছে ঘোড়ার গাড়ি। এই গাড়িতে করেই বিভিন্ন জায়গা ঘুরে নিতে হবে। এই শহরের অন্য আকর্ষণ কাঠগোলা  বাগান।

একসময়ে এই নবাব আমলের বাগানের তত্ত্বাবধানে দায়িত্ব ছিল জগত শেঠের পরিবারের। যিনি নবাবের ব্যাংকার ছিলেন। বর্তমানে দুবার পরিবার এই স্থানটির রক্ষনাবেক্ষন করে  চলেছে। কাঠগোলার ভিতরে  রয়েছে চিড়িয়াখানা, পার্ক ও বোটিং করার জায়গা। এখানে কয়েকটি বাংলা সিনেমার শুটিং হয়েছে।গঙ্গার ওপারে মূর্শিদকুলি খাঁর সমাধি, নবাব আলিবর্দি খাঁ, সিরাজউদ্দোল্লা ও তাঁর পরিবারের সমাধি। 

ভাগিরথীর তীরে মতিঝিল, মূর্শিদাবাদের (Murshidabad) নবতম আকর্ষন। মিউশিকাল ফাঊন্টেন ছাড়াও “লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো”-তে  নবাবদের সময়কার নানা মুহূর্ত তুলে ধরা হয়, যা বহুদিন পর্যটকদের স্মৃতি জুড়ে থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here