Amritsar: অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে

2
38

টিমে অনেকজন আছে, অথচ মতানৈক্য হলো। আমি আরও কয়েকজন যেতে চাইছি সিমলা, অন্য সবাই অমৃতসর। কী আর করা যাবে, এখানেও যে দলের পাল্লা ভারি তার দিকেই ঝুঁকতে হলো। আপাতত সিমলা থাক। পরে যদি কোনওদিন হয় দেখা যাবে।

আপনারা ভাবতেই পারেন, এ আবার কি রকম কথা, আগে থেকে ঠিক করে নিয়েই তো সবাই ঘুরতে যায়! কোথায় সিমলা আর কোথায় অমৃতসর! না বাবা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, কেমন যেন অবাস্তব মনে হচ্ছে!

খোলসা করেই বলি তাহলে, আমরা তখন কয়েকজন চন্ডিগড়ে।

এই আলোচনাটা হচ্ছে ওখানেই। যাই হোক আমার এক ভাই-কাম-বন্ধু ইন্দো-টিবেটিয়ান বর্ডার পুলিশ(ITBP)-এর কর্মরত অফিসার। সে সেইসময় চন্ডিগড়েই ছিল। তার সাথে যোগাযোগ করলাম, সে আর্মড গার্ড সহ জিপে করে চলে এলো।

আমাদের দু’জনকে তাদের অফিসার মেসে নিয়ে গিয়ে খুব খাতির যত্ন করার পর তাঁর কাছে জানতে চাইলাম, সিমলার দিকে কতটা সে নিয়ে যেতে পারবে? তাঁর কথায় যা বুঝলাম, এখন ওদের গাড়িই ওদিকে অসুবিধার মধ্যে পড়ছে, চারিদিক বরফাচ্ছাদিত।

ওদের জওয়ানরা বর্ডার রোড ওয়েজ রাস্তা পরিষ্কার করার চেষ্টা করছে। অতএব সিমলা আপাতত ক্যানসেল। চলো অমৃতসর। ভাইটি আবার অমৃতসরের একজন অফিসারকে ফোনে আমাদের যাওয়ার ব্যাপারটা জানিয়ে ওনার ফোন নম্বরটা আমাকে দিয়ে যোগাযোগের জন্য রেখে দিতে বলল। 

বাসে চললাম অমৃতসর। অমৃতসরে এসে ঐ অফিসার ভদ্রলোকের সাথে যোগাযোগ করেছিলাম, গিয়েছিলাম ওনাদের I.T.B.P কম্পাউন্ডেও, তিনি তখন ওয়াঘা সীমান্তে ডিউটিতে। অগত্যা আমাদের ভরসা শুধু সেই   স্বর্নমন্দির।

অমৃতসরে গুরুদ্বোয়ারা রোডে একটা গুরুদ্বোয়ারায় থাকার ব্যাবস্থা করে মালপত্র রেখে চললাম প্রধান আকর্ষণ স্বর্নমন্দির দেখতে।

প্রথমেই যে বিষয়টায় অবাক হলাম তা হলো জুতো জোড়া খুলে রাখার বিষয়। সব মন্দিরেই প্রবেশ করতে জুতো খুলেই যেতে হয়। এতে কোনো নূতনত্ব নেই। কিন্তু জায়গায় জুতো রাখতে গিয়ে প্রায় চমকে উঠে দেখলাম, তাঁরা পরম যত্নে আমাদের ধুলোমাখা চটি জুতোগুলোকে নিয়ে একটা নির্দিষ্ট খাপে রেখে আমাদের একটা কুপন ধরিয়ে দিচ্ছেন। এই কাজের দায়িত্বে যাঁরা আছেন তাঁরা সবাই বেশ অভিজাত। তাঁরাই আবার ফেরার সময়ও সেই যত্ন সহকারে পায়ের কাছে জুতো নামিয়ে দিলেন। এভাবেই এঁরা বুঝিয়ে দিলেন, ‘সবার ওপরে মানুস সত্য, তাহার ওপরে নাই’। 

যাই হোক, জানি না আর কী চমক অপেক্ষা করছে। প্রধান প্রবেশ দ্বারের সামনে দু’জন দীর্ঘ দেহী শিখ যুবক পাহারায়। আমাদের কাছে সিগারেট লাইটার আছে জানাতে, তার মধ্যে একজন সামনের দিকে পাঁচিলের গ্রিলের নিচে নির্ভয়ে রেখে যেতে বললেন। ফিরে এসে ঐ জায়গাতেই আমাদের জিনিষগুলো ফিরে পেলাম। মাথায় ফেজের মত কাপড় দিয়ে সামনে বয়ে চলা জলে পা ভিজিয়ে তা শুদ্ধ করে প্রবেশ করলাম স্বর্নমন্দিরে। আশ্চর্য নীরবতা। এত মানুষ কিন্তু সবাই কেমন চুপচাপ। কথা বললেও তা যাকে বলছে সে ছাড়া কেউ শুনতে পাচ্ছে না। সামনেই হরমিন্দর সাহিব!! মানে সেই বিশাল সরোবর। চারিধারে বাঁধানো পরিষ্কার মোজাইকের চত্বর। জলে খেলা করে চলেছে বড় বড় রং বে-রং-এর মাছ। কেউ কেউ তাদের দিকে খাবার ছুঁড়ে দিচ্ছে।

ডান দিকে সরোবরের বেশ কিছুটা ভেতরে সেই বিখ্যাত হরমিন্দর সাহিব বা দরবার সাহিব। যাকে আমরা চলতি কথায় বলে থাকি স্বর্নমন্দির।

বাঁ দিক দিয়ে ঘোরা শুরু করে প্রথম লঙ্গরখানা দেখলাম। কি বিশাল! একে এত বড় বিল্ডিং যা ওখানে থাকার জন্য ব্যবহার করা হয়, সেগুলি দেখে আরেকটি দরজার সামনে এসে পৌঁছলাম।

ব্লু স্টার অপারেশন এর সময় না কি এই দিক দিয়েই ভারতীয় ফৌজের বাহিনী মন্দিরে পৌঁছেছিল!

এগিয়ে চললাম তাকে অতিক্রম করে। 

লক্ষ্য এবার হরমন্দির সাহিব বা স্বর্নমন্দির। 

সামনেই ডান হাতে সরোবরের বেশ কিছুটা ভেতরে যা একটা সেতুর মাধ্যমে মূল মন্দিরের সাথে যুক্ত। অগনিত মানুষ কয়েকটা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়ালাম। তারপর আবার এগিয়ে চললাম। ধীরে ধীরে, একসময় মূল মন্দিরের চাতালে এসে প্রবেশ করলাম গর্ভ গৃহে। শিখ ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ গুরু গ্রন্থ সাহেব রাখার জায়গাটি একটা ঘেরা জায়গায়। যা ঘিরে ভজন গেয়ে চলেছেন একদল শিখ ধর্মপ্রাণ মানুষ। যে ভজনের রেশ ছড়িয়ে পড়েছে স্বর্নমন্দির সহ সমস্ত চত্বরে!! এক অদ্ভূত নীরবতা অন্যান্য মানুষদের মধ্যে। ফেরার সময় একজন প্রত্যেকের হাতে দিচ্ছেন প্রসাদ। এত মানুষ তবু কোনও বিশৃঙ্খলা নেই। অদ্ভূত নীরবতা। সকলেই ধীর স্থির। দু’দিন ছিলাম, সকাল রাত মিলিয়ে তিনবার গিয়েছিলাম। লঙ্গরে বসে খেয়েওছিলাম। সুশৃঙ্খল ভাবে হাজারে হাজারে মানুষ খাচ্ছেন, ধনী দরিদ্রের কোনও ভেদাভেদ নেই, সব্বাই মাটিতে বসে নিজের থালা বাটি সংগ্রহ করছেন, খাওয়ার পর আবার নির্দিষ্ট জায়গায় তা রেখেও দিচ্ছেন।

সব থেকে অবাক হওয়ার বিষয়, যাঁরা আমাদের এঁটো বাসন মাজছেন, তাঁরা কেউই সাধারণ কিংবা সে অর্থে  গরীব মানুষ নয়। স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত নারী-পুরুষরা সব কিছু সেবা হিসাবেই করে চলেছেন।

স্বর্নমন্দির চত্বরে রক্ষী থেকে শুরু করে মিনিটে মিনিটে মন্দিরের সমস্ত চত্বর ও এলাকা পরিষ্কার রাখা থেকে শুরু করে রান্না, পরিবেশন, এঁটো বাসন মাজার মানুষজন সবাই এভাবেই হাসি মুখে মানুষের সেবা করে চলেছেন। 

এ তো গেল মন্দিরের কথা।

কিন্তু মন্দিরটি কীভাবে এখানে হলো সে বিষয়ে একটু আলোকপাত করা যাক।

১৫০২ সালে লাহোর থেকে ২৫কিমিঃ দূরে জি. টি. রোডের ধারে এই প্রকান্ড জলাশয় দেখেন শিখ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গুরু নানক। তিনি সেই জলাশয়ের নাম রাখেন অমৃক সায়র। তিনি এখানে এক মন্দির প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন।

সেই জলাশয়কে ঘিরেই পরবর্তী সময়ে তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়। গড়ে ওঠে অমৃতসর শহর। সরোবরের নামকরন হয় হরমিন্দর সাহিব।

ষোড়শ শতকে শিখ ধর্ম গুরু মন্দির নির্মাণ শুরু করেন।

সম্ভবত, ১৬০৪ সালে শিখ ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ গুরু গন্থ সাহেব এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়।

প্রায় সাড়ে ৪ বর্গ কিমি জায়গা জুড়ে এই মন্দির চত্বরে অনেক বিল্ডিং আছে, আছে থাকার জায়গা , খাবার জায়গা লঙ্গরখানা, আর আছে একটি মিউজিয়াম।

দশম শিখ গুরু গুরুগোবিন্দ সিং শিখদের চিরন্তন গুরু ও শিখ ধর্মের নেতা বলে ঘোষনা করেন।

বিশ্বের প্রধান প্রধান দ্রষ্টব্য স্থানগুলির মধ্যে সব থেকে বেশি ভীড় হয় এখানেই- লন্ডনের “ওয়ার্ল্ড বুক অফ রেকর্ডস” থেকে এই তথ্য পাওয়া যায়।

2 COMMENTS

  1. Ki odbhut ekta ghotona. Kotha theke kothay giye porlen, ar ki opurbo ekta onubhuti holo. Dhonyobad share korar jonyo. Amra koyekjon gechilam shornomondirey, aj theke bochor 5 ek agey. Apnar lekhay shei onubhuti gulo firey forey elo.

    Achcha apnara wagah gelen na keno?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here