কলকাতা থেকে ভলভো বাসে ডেস্টিনেশান উত্তরবঙ্গ (north bengal) । চার বন্ধু। দোল পূর্ণিমায় উত্তরবঙ্গ মানেই ঝকঝকে নীলাকাশ, সাদা মেঘের ভেলা, সুদীর্ঘ রণপা পরা শালের জঙ্গল আর যত্রতত্র কাঞ্চনজঙ্ঘার (kanchenjunga) উঁকিঝুঁকি। করনা ভাইরাসের আতঙ্ককে পাশ কাটিয়ে কমলালেবুর হাতছানিতে সোজা ছোটামাঙ্গোয়া (chota mangwa)। যদিও কমলার মরসুম প্রায় শেষ। 

দোলের হুল্লোড় এড়িয়ে কমলালেবুর গ্রামে ছুটি কাটানোর মজাই আলাদা। একদম অফবিট ডেস্টিনেশান। ঘরের বাইরে থেকেও ঘরের আন্তরিকতা আর উষ্ণতা। ভাবুন তো, ঘরের জানলা দিয়ে গাছের ডালে ডালে পাকা কমলালেবু আর নীল আকাশের নীচে উত্তুঙ্গ পাহাড়ের প্রাকৃতিক শোভায় ভরপুর বেশ কয়েকটি নিশ্চুপ, নিঝুম মায়াবি গ্রামের মাঝে নিশ্চিন্ত নিরুপদ্রব একটি দিন!
View from Chota Mangwa
শিলিগুড়ি (siliguri) তেনজিং নোরগে বাসস্ট্যান্ড থেকে সেবক (sevok), তিস্তাবাজার (tista bajar) হয়ে ৬০ কিলোমিটার রাস্তা। পাহাড়ের গায়ে সবুজের সমারোহ। ঠাণ্ডার বহরটা বেশ ভালই। এখান থেকেই সবুজের ফাঁকে মাঝে মাঝেই নাম না জানা রঙিন পাহাড়ি ফুলের বিছানা। ঠিক যেন পাহাড়ের গায়ে বিছানো এক ডিজাইনারের ডিজাইন করা দুর্দান্ত এক বেডসিট। কমলালেবুর গ্রাম লাস্যময়ী সুন্দরী ছোটামাঙ্গোয়া (chota mangwa) হিমালয়ের (himalaya) কোলে এক খুবই সুন্দর ভার্জিন পাহাড়ি গ্রাম (virgin hamlet on the hills of darjeeling & siliguri)। 

পাহাড়ের আদরমাখা কোলে কোন জাদুকর যেন যাদুকাঠির ছোঁয়ায় এক আশ্চর্য সুন্দর পাহাড়িয়া গ্রামকে নিখুঁত ভাবে বসিয়ে রেখেছে। এখানে সবুজের রং ফিকে করে দেয় কমলার বাহার। নীল আকাশের নীচে সবুজেরা ঝকমকে, মিঠে রোদ চলকে পড়ছে কমলালেবুর উপর। অনেক নীচে তিস্তার আঁকাবাঁকা বিস্তার অসাধারণ। প্রায় সাড়ে চার হাজার ফুট উচ্চতায় শীতমাখা এই গ্রামে কমলালেবুর বাহার। সঙ্গে প্রাকৃতিক শোভায় ভরপুর এক নির্জন, নিসর্গের সেরা ঠিকানা।
Chota mangwa
তিস্তা বাজারকে (tista bajar) বাঁয়ে রেখে প্রায় ১২ কিমি এক নির্জন পথ, পাইন আর রোডোডেন্ড্রন এর শোভা দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছালাম আমাদের গন্তব্যস্থল, “শ্রী গণেশ হোম স্টে“, ছোটামাঙ্গোয়া (chota mangwa)। হোটেলের মালিক কিরন ছেত্রী, নেপালি হিন্দু, প্রকৃতি-সারল্য হাসি হাসি মুখে আমাদের সাদর অভ্যর্থনা জানালেন। পশ্চিম আকাশে পাহাড়ের কোলে তখন পড়ন্ত সূর্য। হোমস্টের অবস্থান একদম প্রকৃতির কোলে। পাহাড়ের মাঝে কোলাহলহীন, ফুল দিয়ে সাজানোগোছানো হোমস্টে। প্রকৃতি এখানে অকৃপণ।
 
আতিথেয়তা আর থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা চমৎকার। হোমস্টের ফার্মে রাসায়নিক সার মুক্ত ফসলের বাহার চোখ এড়িয়ে যায় না। সন্ধ্যা গাঢ় হলে পেয়ালায় ধোঁয়াওঠা  চা আর গরম গরম অতি সুস্বাদু ভেজ পকোড়ার আলাপে আসর জমে উঠলো। চা পকোড়া খেতে খেতে অদূরে আলোকমালায় সজ্জিত পাহাড়ি গ্রামগুলো দেখার মজাই আলাদা। এক নিমেষে সারাদিনের ক্লান্তি দূর হয়ে গেল।
 
ঠান্ডা বেশ জাঁকিয়ে পড়ছে। খুবই মনোরম আবহাওয়া। কিছুক্ষণ পর কিরনভাই বন ফায়ারের ব্যবস্থা করে দিলেন। চার বন্ধু চেয়ারে বসে আগুনের ওম নিতে নিতে আর একপ্রস্ত চা আর পেঁয়াজ-পকোড়া। দূষণবর্জিত ঝকঝকে পরিষ্কার আকাশে দোল পূর্ণিমার গোলাকার চাঁদের যাদুময় রূপ। অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছে। চারিদিকে নির্ভেজাল  নিরাপদ এক অপরূপ শোভা, যেন আমরা কোন এক রূপকথার গল্পের বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছি। অদ্ভুত এক ভালো লাগায় আমরা সকলে রোমাঞ্চিত। এই হোমস্টের বিশেষত্ব হচ্ছে লাঞ্চ বা ডিনার উভয় মেনুতে নিজেদের চাষ করা ভেষজ সব্জির নানা পদ। রাতের মেনুতে বিভিন্ন সব্জিপদ। দেশী চিকেনর সুস্বাদু ঝোল। নিজস্ব ফার্মের দেশি গাওয়া ঘি। খেয়েদেয়ে এবার শোবার পালা।
Chota mangwa Ganesh Home Stay
chota mangwa
ভোর সাড়ে পাঁচটা। পাখির কলতানে ঘুম ভেঙে গেল। ফ্রেশ হয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম সানরাইজ ভিউ পয়েন্টে। এ পথেও দেখা মিলল গাছে গাছে পাকা কমলালেবুর উচ্ছ্বাস। পাহাড়ের কোলে কোলে বাঁশবাগানের ভেতর দিয়ে দশ মিনিটে গুটিগুটি পায়ে পৌঁছে গেলাম ছোটামাঙ্গোয়া ভিউপয়েন্ট (chota mangwa viewpoint)। 

অসাধারণ দৃশ্য। দিনের প্রথম সূর্যের রক্তিম আভায় উদ্ভাসিত দিগন্তবিস্তৃত পাহাড়রাশি। গ্রামের অপর অংশ থেকে দৃশ্যমান অপরুপ মোহময় স্লিপিং বুদ্ধ, কাঞ্চনজঙ্ঘা। চারিদিকে রংতুলি দিয়ে সাজানো নানান ফুলের ডালি নিয়ে ছোটামাঙ্গোয়া (chota mangwa) পাহাড়ি গ্রাম। পাখির ডাকও ভেসে আসছে কোন এক অজানা জায়গা থেকে। আর দূরে ছোটো ছোটো গ্রামগুলো পাহাড়ের ঢালে; এক মায়াবি পরিবেশ। 
 
একরাশ মনভালো করা স্মৃতি নিয়ে হোমস্টের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। এসে ফার্মের নিজস্ব গরুর খাঁটি দুধের চায়ের কাপে চুমুক। একটু বেলায় কাঞ্চনজঙ্ঘাকে (kanchenjunga) সাক্ষী রেখে হোমস্টের সুসজ্জিত বাগানে বসে গরম গরম রুটি, চানার সুস্বাদু তরকারি, ডিমের অমলেট ও আচার সহযোগে ব্রেকফাস্ট। সুস্বাদু ব্রেকফাস্ট করেছেন কিরনের স্ত্রী অঞ্জু। ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়লাম গ্রাম দেখতে। সঙ্গী হোম স্টের মালিকের ছেলে, অভিজ্ঞা। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। প্রতিদিন স্কুল যাতায়াত করে দু’ঘন্টার পাহাড়ি পথ পেরিয়ে। অদ্ভুত সুন্দর সারল্যমাখা মুখখানি। বড্ড মিষ্টি ছেলে।

পাহাড়ি রাস্তায় হিমেল হাওয়ার অবাধ আনাগোনা। গোটা এলাকার নিস্তব্ধতা ভেঙে দেয় অজানা পাখির কলরব। দুপাশে রঙিন ফুলের ডালি সাজিয়ে প্রকৃতি দুহাত বাড়িয়ে আলিঙ্গন করছে। কিছু দূর এগিয়ে কানে আসছে ঝিরিঝিরি জলের শব্দ। আর একটু এগোতেই চোখে পড়ল ছোট্ট এক ঝরনা পাহাড় বেয়ে তিরতির করে নেমে আসছে। নিস্তব্ধতা যেন এখানে পাল্লা দিয়ে ভিড় করেছে। অজান্তেই মন উদাস হয়ে যায়ে। 
 
দূপুরে চীনা হাঁসের ডিমের কারি আর রাই শাক, পাপড় ভাজা, ডাল, গাওয়া ঘি আর কুলের আচার সাথে স্যালাড। আবার আমাদের গাড়ি রওনা দিল শিলিগুড়ির (siliguri) দিকে। ফাঁকা রাস্তা। বাঁদিকে তিস্তাকে (tista) রেখে হু হু করে ছুটে চলেছে গাড়ি। একরাশ সুখস্মৃতি নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে চলেছি, দুদিকে শাল সেগুনের সারি ছুটে চলেছে  পেছনে। আর একবার অক্টোবর-নভেম্বর মাসে আসার ইচ্ছে রইল ‘পাকা কমলালেবু বাগানে’ সজ্জিত ছোটামাঙ্গোয়াকে (chota mangwa) দেখতে।
Chota mangwa
কমলার মিষ্টি স্বাদে মজে দুটো দিন অনায়াসে কাটিয়ে দিতে পারেন দুই যমজ কমলালেবুর গ্রামে ছোটামাঙ্গোয়া (chota mangwa) ও বড়ামাঙ্গোয়া (bara mangwa)।  এখানকার কমলার মতো অরগানিক ফুডের (organic food) স্বাদ অনেক দিন  মুখে লেগে থাকে। পূর্ব হিমালয়ে (eastern himalayas) ছোটামাঙ্গোয়ার (chota mangwa) মতো রংবাহারি গ্রাম খুব কম রয়েছে। উচ্চতা ৪-সাড়ে ৪ হাজার ফুট। যারা একদম নিরালা নিভৃত কোলাহলবিমুখ জায়গা পচ্ছন্দ করেন তাদের ছোটামাঙ্গোয়া খুব ভালো লাগবে। প্রকৃতিপ্রেমিক এবং যারা নির্জনতা পচ্ছন্দ করেন তারা দুতিন দিনের জন্য মন, শরীর ও আত্মাকে সতেজ করতে ঘুরে আসুন।

কখন যাবেন – শীতকালে কনকনে ঠাণ্ডা নেই আছে কমলালেবুর হাতছানি। আবার গরমেও মনোরম। বর্ষায় সবুজের ঢল। আর ফুল দেখতে হলে বসন্তে চলুন।    
 
কিভাবে যাবেন –  শিয়ালদা বা হাওড়া স্টেশন থেকে এনজিপিগামী ট্রেনে এনজিপি (new jalpaiguri)। অথবা বাসে। তারপর এনজিপি থেকে মাত্র ৬০ কিমি দূরে ছোটামাঙ্গোয়া (chota mangwa)।
 
কোথায় থাকবেন – বেশ কয়েকটি ছোট হোমস্টে আছে ( ভাড়া ১০০০ টাকা মাথা পিছু থাকা, খাওয়াসহ)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here