(ঘটনা কাল সতেরো শতকের স্পেন। গোঁড়া ক্যাথলিক নিয়মের বাঁধনে বাঁধা সমাজ। সেই সময়কার ইউরোপের সমস্ত জায়গায় প্রায় একই অবস্থা। অমিতার দেখা হোলো এঞ্জেলার সাথে)

অমিতা একবার সাত রাত আট দিনের ট্যুরে ইউরোপ ভ্রমণে গেছিলেন। সব শেষে ছিল লন্ডন। এই শহর তার মোটেই ভাল লাগেনি। তবে কি ভেবে যেন তাদের ট্যুরে ন্যাশানাল মিউজিয়ামের জন্য দু ঘণ্টা বরাদ্দ হয়েছিল অমিতা জানে না। তার সঙ্গীসাথীরা ছবি দেখার থেকে শ্যুভেনির শপে বেশি আগ্রহ।

অমিতা ঘুরতে ঘুরতে এসে পড়েছেন দিয়েগো ভালাস্কুর ছবিগুলোর সামনে। অনেক বড় একটা ছবি। প্রায় চার ফুট বাই ছয় ফুট। কালো ফ্রেমে বাঁধানো। পিছনের দেওয়াল আলপনা আঁকা কালচে বাদামী ওয়াল পেপারে মোড়া। চোখটা যেন ওই ছবিতে এসেই শান্তি পাচ্ছে। অনেক লোকের ভিড় ছবিটার আশেপাশে। ঘরের এক কোনে একটা ইজেলে এক প্রায় পাকা চুলের বৃদ্ধ এই ছবিটাকে নকল করে চলেছেন এক মনে। কে যেন পিছন থেকে বলে উঠল, Only surviving nude. আরও হাজার ফিসফিসানি। এ দেশের লোক ছবি দেখতে জানে।

অমিতা হারিয়ে যাচ্ছিলেন। তার মাথায় ঘুরছিল একটা নাম ‘এঞ্জেলা’। কে এই এঞ্জেলা তিনি জানেন না। কিন্তু বেশ মনে করতে পারছিলেন মাদ্রিদ শহরের গলি। টোলেডো শহর। চার্চ। সদ্য মাদ্রিদ থেকে প্যারিস হয়ে লন্ডন এসেছেন। কল্পনায় সেই শহর। 

সেখানকার এক পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই বুড়ো পেন্টারের বাড়িতে এঞ্জেলার যাতায়াত। বিশাল বাড়ি। মাস দুয়েক হোলো তাকে মডেল করে শিল্পী ছবি আঁকছেন। তবে রাত্রিবেলা। মোমবাতির আলোয়। অন্যান্য দিনে রাজপুরুষরা আসেন। তাদের প্রতিকৃতির অসমাপ্ত বিশাল বিশাল ক্যানভাস দাঁড় করানো ঘরের একপাশে। এক একটা ছবি শেষ হতে মাস গড়িয়ে যায়। যেদিন এঞ্জেলা আসবে, আর কারো সেই ঘরে প্রবেশাধিকার নেই। এঞ্জেলার শরীর বিভঙ্গ তাবড় পুরুষের মনে ঢেউ তোলে। কিন্তু সে অবাক হয় তার প্রতি এই শিল্পীর নিঃস্পৃহতা দেখে।

তার কাঁধের রেখার উপর দিয়ে যখন হাত বোলান শিল্পী, সে ছোঁয়ায় কাম নেই। কেমন একটা জলের ধারার পেলবতা আছে। কোমরের ঢালে শিল্পী দু হাত দিয়ে মাপেন রেখার চলন। প্রথম দিকে তার অস্বস্তি হোতো। আড় চোখে তাকিয়ে দেখেছে শিল্পীর চোখ বন্ধ। নিজেকে সরিয়ে নিয়ে দেখেছেন, শিল্পীর ধ্যান ভাঙেনি। হাতগুলো খেলা করছে হাওয়ায়। যেন মেঘের চলন। অথবা ব্যালের মুদ্রা। নাকি পিয়ানোতে সুর তুলছেন কোনো সাধক।

সামনে সাদা ক্যানভাস। একদিন সেখানে হাল্কা আম্বার রঙের প্রলেপ পড়ল। সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ল মিষ্টি টারপিন ও লিনসিড তেলের সুবাস। অমিতার কাজ সপ্তাহে একদিন আসা দু ঘণ্টার জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় শুয়ে পড়া। কোনো দিন বসন খুলতে হয় কোনো দিন নয়। কোনোদিন শিল্পী তাকে শুইয়ে দিয়ে একটা নরম সাদা কাপড়ে ঢেকে দেন সারা শরীর। কোনো দিন হয়তো কিছুই আঁকেন না। তাকিয়ে থাকেন সারা সময়টা। কিন্তু কি ছবি আঁকা হচ্ছে দেখার অনুমতি নেই।

একদিন তার সিটিং দেওয়ার প্রয়োজন ফুরালো। আয়ও যে বন্ধ হবে, এই চিন্তা বড় চিন্তা। না তার পরেও ছ মাস তার বেতন নিয়মিত পৌঁছে যেত ঘরে। যে ভৃত্য এই বেতন পৌঁছানোর কাজটি করত তাকে কারণ জিজ্ঞাসা করলে বলে, তাঁরই ছবি নাকি আঁকা চলছে।

একদিন দরজায় আওয়াজ পেয়ে খুলতেই সামনে শিল্পী। ডাকতে এসেছেন তার মডেলকে। সে এক পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার। কোনো রকমে গা মাথা ঢাকাঢুকি দিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। ঘরে ঢুকে প্রথম যেখানে চোখ পড়ল, সামনের দেওয়াল জুড়ে শোভা পাচ্ছে তাঁরই ছবি। বাম দেওয়ালে একটা আয়না। পাশ ফিরতেই সেই আয়নায় এঞ্জেলা দেখতে পেল নিজের লজ্জায় রাঙা হওয়া গাল। সাদা চাদরটা চিনতে পারা যাচ্ছে। ছবিতে বাচ্চাটা যে আয়না ধরে আছে সেখানে একটা মুখের আভাস। নিজেকে চিনতে পারছেন না অমিতা।

ছবিতেও একটা আয়না। সেখানে অস্পষ্ট মুখের ভাষা। কিন্তু কেন? আয়নাটা ধরে আছে একটা বাচ্চা। ছেলে না মেয়ে বোঝা যাচ্ছে না। অমিতা নিজেকে খুঁজতে চান ওই আয়নার মুখে। পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন শিল্পী সহধর্মিনী। তাকিয়ে দেখেন আয়নার মুখে যেন তার ছায়া। কেন এই রহস্যময়তা? শিল্পীর অন্য ছবিতেতো এমনটা নেই।

এঞ্জেলার সম্বিৎ ফেরে। আতঙ্কিত হয়ে পড়ে শিল্পীর কথা ভেবে। তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে দেয়। স্পেনের আইন অনুসারে নগ্ন নারী বা পুরুষের ছবি আঁকা দণ্ডনীয় অপরাধ। ধরা পড়লে জেল বা দেশ থেকে নিষ্কাশন। 

  • এ ছবি তুমি কেন আঁকলে শিল্পী? 

শিল্পী কিন্তু নিরুদ্বিগ্ন। হাসছেন।  

  • রাজা চতুর্থ ফিলিপের রাজ শিল্পী আমি। তুমি জানো রাজ অন্তঃপুরে রুবেন্স ও টিশিয়ানের কত বিশাল বিশাল ন্যুড কম্পোজিশন টাঙ্গানো আছে?
  • সে হয়তো আছে। তিনি রাজা; তাকে তো আর দেশ ছাড়া করা চলে না। আর রাজার আইন ও প্রজার আইন আলাদা। তুমি এ ছবি নষ্ট করে ফেল। 
  • সে হয়না… তীব্র প্রতিবাদ শিল্পীর। আমি নগ্ন ছবি এঁকেছি ঠিক। কিন্তু এ ছবিতে কামনার কোনো স্থান নেই। ভালোবাসা আছে। শান্তি আছে।
  • না শিল্পী, তুমি জানোনা ওই পাদ্রীদের। এরা কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে তার ধারনা নেই তোমার। তোমার শিল্প ওরা বুঝবে না। 
  • থমকে যান শিল্পী।তার মনে পড়ে চার্চের তলায় গোপন অত্যাচার কক্ষের কথা।ভাবনায় পরে যান।ভয় পান।কিন্তু মন থেকে মেনে নিতে পারেননা তার সৃষ্টির অবমাননা।ছবিটা নষ্ট করে ফেলার কথা তিনি ভাবতেই পারছেন না। 
  • এক কাজ কর, ওই বাচ্চাটার পিঠে দুটো ডানা এঁকে দাও। কিউপিড। আয়নায় সভ্য মানুষকে দেখাচ্ছে তার না দেখা চেহারা। “কিউপিড ও ভেনাস”। চার্চের রোষ থেকে বাঁচার পথ…  
  • ঠিক। কথাটা মনে ধরে শিল্পীর। কিন্তু অবাক হন, কি সাহস মেয়েটির! তাকে ছবি নিয়ে জ্ঞান গিচ্ছে!

এর কিছুদিন বাদে শিল্পী ছবিটা দিয়ে দেন ডমিংগো গুয়েরা করোনেল নামে মাদ্রিদের এক অখ্যাত শিল্প বিক্রেতাকে। তখন তার নাম ছিল, ‘Painting of a nude Woman’। ব্যাস আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি ছবিটির পরের একশ বছর। শুধু গ্যালারি মালিকের ডায়রি ছাড়া। ১৭৪৯-৫১ র মধ্যে এই ছবি সে সংগ্রহ করেছিল। রাজকীয় সব চিহ্ন বর্জিত এক ছবি। এক সাধারণ মেয়ের টলটলে পিঠের ছবি। সে যেন অপেক্ষায় আছে তার প্রিয়তমের। বাহুল্য মনে করে ড্রেপারি আঁকা হয়নি। অতি সাধারণ অন্তঃপুরের ছবি। তবে যে কোনও ভালোবাসায় আড়াল চাই। তার ব্যাবস্থাও যে আছে বোঝা যাচ্ছে ভারী পর্দার উপস্থিতিতে।  

কিন্তু কে কিনবে এই ছবি? এক নিষিদ্ধ ছবি। বংশ পরম্পরায় হাত বদল হতে হতে ১৮১৪ সালে  তার বংশধর ডন ম্যানুএল গ্যাডুএর এর কাছ থেকে এক ব্রিটিশ ধন কুবের জন বেকন সরি মরেট পাঁচশ পাউণ্ডের বিনিময়ে এই ছবি সংগ্রহ করেন। অর্থাৎ আঁকার প্রায় পয়ষট্টি বছর পর ছবিটি দেশ ত্যাগ করল। চিরতরে। এই জন বেকন সরি মরেট থাকতেন লন্ডন শহরের রকবি পার্ক এলাকায়। তার বাড়ির বৈঠক খানায় এমন অনেক ন্যুড পেন্টিং ছিল। এটাই তার প্যাশন। এই বাড়িতে ছবিটা ছিল ১৯০৫ সাল অব্দি। সেখান থেকেই ছবি নাম পায় “রকবি ভেনাস”। 

তবে চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়। চোখের খিদের থেকে যেদিন পেটের খিদের টান বেশি হয়ে গেল বেকন সাহেবের উত্তরসূরিরা বেচে দিতে চাইলেন ছবিটা। দাম উঠলো ৪৫০০০ পাউণ্ড। সম্ভাবনা দেখা দিল দেশান্তরিত হওয়ার। রকবি ভেনাস রাতারাতি বিখ্যাত। রানীর শ্লাঘাতে আঘাত করল এই ঘটনা। সিদ্ধান্ত হোলো রকবি ভেনাসকে রেখে দেওয়া হবে ইংল্যান্ডের জাতীয় সম্পদ হিসাবে। তবে সমস্যা টাকাকড়ির। ১৯০৩ সালেই ন্যাশানাল আর্ট  কালেকশন ফান্ড প্রতিষ্ঠা হয়েছে শিল্প কর্মের রক্ষার্থে। কিন্তু তার বাৎসরিক বাজেট মাত্র ৫০০০ পাউন্ড। রাজ পরিবার থেকে দান এল ৮০০০ পাউন্ড আর বাকিটা এল সাধারন মানুষের কাছ থেকে। সেই ১৯০৫ থেকে রকবি ভেনাস ন্যাশানাল গ্যালারির অহংকার। 

এই ভেনাসের টানে রাজা নেমে এসেছেন পথে। ভেনাস রাজগৃহে কোনোদিন যান নি। 

এঞ্জেলারা অমিতা নামের মেয়ে হয়ে আজও ঘুরে বেড়ায় নন্দন-একাদেমি চত্তরে…  

Dibakar Das
দিবাকর বিখ্যাত চিত্রশিল্পী ও ফটোগ্রাফার। লেখকও বটে। অজয় নদী নিয়ে বিশেষ প্রেম ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here