কাঁসাই ক্যানেলের সামনে গাড়ি এসে ভিড়েছে। ক্যানেলের দু’ধারে তুমুল জঙ্গল। রক্তিম মাটি। শীতের শেষে বন এখন নিঃস্ব – রিক্ত – হরিজন। গাছের পায়ের কাছে স্তুপাকার ছিন্ন পত্রগুলি তারি চ্যুত সম্পর্ক। শীতের এ-হেন যাই যাই বেলায় বসন্তের আগমন বার্তা পৌঁছে গেছে প্রকৃতির আনাচে কানাচে। সে যেন ডেকে বলে – ‘আমায় নূতন করে দে নূতন আভরনে।’ ওদিকে গাড়ির টেপ-এ গান চলছে – ‘আমার যাওয়া তো নয় যাওয়া।’ 

মন বলে, কোনও যাওয়া যেমন যাওয়া নয়, তেমন ফেরার ফেরি ফিরে এসেও ফেরার হয়ে যায়। বাঁকুড়ার (bankura) মটগোদা থেকে রানিবাঁধের এই ১৩ মাইল পথ ধরে যতবার গেছি জলভরা সেচখাল, মায়াবী বন, আর এই অখন্ড নীরবতা গাড়ির গতি থামিয়ে ছাড়ে, মনের নধ্যে ভাবনার এলোমেলো বাতাস বাড়ে। গান – বন – ভাবুক মন তিনকে লগ্নি করে মোরামে বসে পড়েছি মটগোদা বাজার থেকে সওদা করা লবঙ্গ ও রসকদম্বকে উপযুক্ত মর্যাদা দিতে। 

এমন পাগলাটে কর্মকান্ড দেখে ক্ষমাটে এক সাইকেল আরোহী এসে দাঁড়ালেন, এবং সতর্ক-বার্তা দিলেন – অ্যাই সড়পটিতে গনেশ বাবার(হাতি) দমে আগমন, জান নাই? আমাদের চালকটি বলে- হামি রসিকচাঁদ সহিস থাকতে ডরের কন বেপার নাই। ঠাকুর বাবাকে ইমন বান ছুড়ব, এক কড়া লড়বেক নাই। রসিকচাঁদ বলে – তু যাঃ ক্যানে। লোকটি ব্যাপার বুঝে বলেন – ঢোলের লে ডোমের আওয়াজ বেশি। ঠাকুর বাবার হামলা হঁল্যে তুমার ঢপবাজি ঘুঁচাবে। লোকটি তাঁর বাহনে চড়ে বসে প্যাডেল মারলেন। 

পাইকারি চালে এ ভ্রমণ এমনটা নয়। আমাদের দস্তুর হল, যেতে যেতে থেমে নেমে কাট পিস ট্যুর। যাত্রা পথে গাড়ি রোখে আসন গাছের ছায়ায়। মাসের উচক্কা ছেলেরা ধমসায় চামড়া চড়াচ্ছিল। বুঝলাম ওরা হাতি খেদার প্রস্তুতি নিচ্ছে। রসিকচাঁদ জানাল, পূর্ণপানি মৌজাভূক্ত এ গায়ের নাম ছোট টুং। গাড়ি দেখে উঠে দাঁড়াল ছেলেগুলি। কয়েক প্রস্থ অভিযোগ নিয়ে হৈ হৈ করে ছুটে এল। গাড়িটি ঘিরে ধরে হুজ্জুতির মেজাজে বলে – এবারে পাকা গেরেন্টি লিঁইয়ে তবেতে খালাস পাবেক। 

আমাদের চালকটি বলে – লঁকগুলান সহজ – সিধা বটে, কিন্তুক রাগে কাঠগোঁয়ার। লাগছে উয়াঁরা দমে গরম খাঁঞ আছে। গাড়ি থেকে নেমে ওদের ফরিয়াদ ছোট করে বলতে বলি। একজন সক্রোধে বলে – বৃহৎ ফেচাংটি ছুট করব কি কর‍্যে? জানা গেল, ফেচাং এর মূলে হাতি। গনেশ ঠাকুর ফসল খায়, ঘর ভাঙ্গে, মানুষ মারে। গেরস্তর পচাই খেয়ে বেহেড হয়ে কাহাকেও ছাড়ছে নাই। আপ্নারা বন বাবুরা কন বিহিত না দিলে ছাড়ছি নাই। অত বাজা–বাজনা হুলা(মশাল) পটকায় কাজ হঁল্য নাই। 

ওদের থামিয়ে বলি, এখানেও কাজ হবে না। তোমরা যে ভুল জায়গায় দরখাস্ত ফেলেছ ভাই। আমরা সামান্য ট্যুরিস্ট, তোমাদের গ্রাম দেখতে বেরিয়েছি। ট্যুরিস্ট জেনে কদর করে বসায়। পাশের হাঁড়ি থেকে দুধেল ভালোবাসা হাতে ধরিয়ে দেয়। একজন রসিকতা করে বলে, আমাদের রাইস বিয়ার স্যার, লরম করে ঘুঁটা। খান, কন বেইমানি করব্যে নাই। ভরপেট হাঁড়িয়া চড়িয়ে শরীর – মন থর মেরে আছে। আর রসিকচাঁদ তো রসে টম্বুর। সে ঘোড়ার গ্যালপ বাড়িয়ে দেয়। 

ছোট টুং ছেড়ে এসে জঙ্গলের ঝাপটায় পড়লাম। পথের পাশে একটি জলাশয়ের পাশ দিয়ে রোগা সিঁদুরে পথের টান মিশেছে পশ্চিমের ডুংরিতে। শান্ত ছায়াচ্ছন্ন পাড়াগ্রাম। একটি ধীবর দুপুরের ঝোঁকে জাল টানছিল তালাও-এ। গাড়ি থামা, এবং নামা। কোমরে বাঁধা বাঁশের খালোই সরজমিনে খতিয়ে দেখি-কি কি দিল্ভার কয়েন জমা পড়েছে তার তহবিলে। ব্যক্তিটি বলেন আছে-আছে। এই বাঁধে (জলাশয়) দমে মাছ। তার পাত্রে পুঁটি-ল্যাটার দাপাদাপি। 

আরও কিছু উপরে চিংড়ি, ছোট বেলে কাঁকড়া, আর ছোট একটি কূর্ম অবতার। পরের ক্ষেপে খর্শোলা, চ্যালা। তোমার উপুড়-দাম কত? সবেটাই দরকার? হ্যাঁ, দাম বল। অনাদরের এই মানুষগুলি হিসেব নিকেষেও পিছিয়ে পড়া। কেওট পাড়ার মানুষটি অনেকটা সময় ধরে হিসেবের পিঠে হিসেব জুড়ে যা দাঁড় করাল সত্যিই হাস্যকর। ওদিকে শহুরে মানুষ গ্রামকে যে ভাবেই হোক ঠকিয়ে আসতে পারলে আত্মশ্লাঘা লাভ করে। মাছের দাম নিয়ে তেমনটাই ঘটতে যাচ্ছিল, তার মাঝে এসে পড়লেন মশায় হেমব্রম। 

বৃদ্ধ রানিবাঁধ ডাকঘরের অবসরপ্রাপ্ত কর্মী। এ মহলে জানদার লোক হিসেবে মশায় নামে পরিচিত। সেই মশায় এদিকের মনুষ্য জীবনের সুখ অ-সুখ, পসাদ-প্রভঞ্জনের মুস্কিল আসানও। তিনি কেওট পাড়ার এই এল্‌কা  হাঁদা মানুষটাকে দু’কিস্তি গাল পেড়ে বলেন-হকের কড়িটুকুও বুঝে লিঁতে পারিস নাই, কেমোন উজবক বটে হেঁ! মশায় দু’পক্ষের মধ্যে ন্যায্য হিসেব করে দিয়ে বলেন-অ্যাই কাছিম অবতারকে বাদ রাখ। উয়াকে বাঁধের জলে খালাস দাও তোমরা।

এ হেন মানুষটিকে ছাড়া নেই। বাঁধের পাশে বসে পড়ি ওঁকে নিয়ে। ভদ্রলোক মুচকি হেসে বলেন-ল্যাসা  খাঞছ বাবারা? নেশা কোথায়, এ যে দেবতার পানীয়। ঠিক। আমাদের ঘরের বেটিছানারা ঘঁটা করে। শরীর অশুদ্ধ থাকলে হাঁড়িয়া যুটবে নাই। তা তুমাদেরকে ঘর বসত কুথা বটে? হেথা কী দরকার? সবিস্তারে বুঝিয়ে বলি- ঘুরতে এসে টুংকে খঁজে পেয়ে হাঁড়িয়া খাওয়া, তারপর মাছ কিনতে এসে তোমার সঙ্গে মোলাকাত। তবে এই জায়গাটার  নাম এখনও জানা হয়নি। 

মশায় ঠাকুর যা বলেন, তার অর্থ হল- এই পাহাড়টায় এক সময় বিপ্লবীদের ক্রিয়াকর্ম চালু ছিল। পাহাড়ের গুহায় বিপ্লবীরা বোম বানাত। অস্ত্র মজুত রাখত। কুমারী নদী পেরিয়ে গোপন পথে বিস্ফোরক পদার্থ চালাঙ আসতো। অম্বিকানগরের রাজা রাইচরণ ধবল অনেক জায়গার খোঁজখবর করে, অবশেষে ছেঁন্দপাথরের এই নিরাপদ আশ্রয়টিতে বিপ্লবীদের লুকিয়ে রেখে বিপ্লবী কাজকর্ম চালিয়ে যেতে মদত দিয়েছিলেন। এখানে বসেই ক্ষুদিরাম বসু, বারিন ঘোষ, নরেন গোঁসাই বাম বানাতেন। এমন একটি ঐতিহাসিক জায়গায় এসে পড়ায় অবাকই লাগছিল। 

মহাশয়কে বলি, এই গোপন ঘাঁটি কিন্তু গোপন থাকেনি স্যার। একাবারে হক বলেছ। বক্তা এবার কিছুটা নড়েচড়ে বসেন। বলেন, সময়টা ছিল বর্ষাকাল। ব্রিটিশ গোয়েন্দারা খবর পেয়ে ছেঁন্দাপাথর অভিযানের ছক কষল। নেতৃত্ব দিলেন মি. টেগার্ট। লাউড়াপাড়া গ্রামের মুখে এসে কাঁসাই ও কুমারীর মিলিত বিক্রমের কাছে বাহিনী হার মানল। নদীতে কোনও নৌ যানো নেই। 

অথচ নদীটা পেরতে পারলেই অম্বিকানগর, অর্থাৎ, লক্ষ্যে রাজা রাইচরণ। তারপর ছেঁন্দাপাথরে আক্রমণ চালিয়ে কয়েকটা রাঘব বোয়ালকে পোরা খুব সহজ হবে। ব্রিটিশ অভিযানের খবর চারিদিকে চাউর হয়ে গেছে। পানু রজক নামে একজন স্বদেশী আন্দোলনকারী যুবক উত্তাল কাঁসাইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, শত্রু পক্ষের আগমনের খবরটা রাজার কাছে পৌঁছে দিতে। সেই খবর আবার গিয়েছিল ছেঁন্দাপাথরের গুপ্ত ঘাঁটিতেও। তবে অভিযান সেবারে রুখে দিল জোড়া নদী কঁশাই ও কূমারী।

কম করে ১১২ বছর অতীতের ফ্ল্যাশব্যাক। স্থানটির এখনও সেই প্রাচীন চেহারাই আছে। সামান্য বসতি বেডেছে। পথে পিচ পড়েছে। গো শকট গিয়ে দ্রুত গতির যান এসেছে। পাহাড়টিকে দেখে মনে হয়, সময় সেই স্বদেশী যুগেই থেমে আছে। মশায় ঠাকুর গর্ব করে বলেন, মুক্তি আন্দোলনের সর্ব কনিষ্ঠ শহীদ আমাদের ক্কুদিরাম। সেই সুযোগে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিই মশায়কে – বিষয়টা গর্বের তোমাদের কাছে? আমি বলি হঠকারিতা। ক্যান বলছো? তাঁকে সংক্ষেপে বুঝিয়ে বলি – ১৯০৮ সালের এপ্রিল মাস। 

কলকাতার পুলিশ কমিশনার মি.চার্লস টেগার্ট সদ্য স্থানান্তরিত হয়েছেন মজঃফরপুরে। তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছে স্বধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবী দল। অপারেশনের জন্য কলকাতা থেকে পাঠান হয়েছে ক্ষুদিরাম বসু এবং প্রফুল্ল চাকীকে। বৈপ্লবিক আন্দোলনের উন্মাদনায় ফুটছেন সদ্য যুবক ক্ষুদিরাম। ৩০ এপ্রিল, ১৯০৮ এর সন্ধ্যা। স্থানীয় ইউরোপীয় ক্লাব থেকে ফিটন গাড়িতে ফিরছিলেন টেগার্ট সাহেব। সামনে একই রকমের আরও একটি ফিটনে স্থানীয় আইন ব্যবসায়ী মি. কেনেডি এবং তাঁর স্ত্রী। 

অকস্মাৎ বোমা বিস্ফোরণ ঘটল প্রথম গাড়িটিতে। কেনেডি দম্পতি মারা গেলেন। কলকাতায় বসে টেগার্ট হত্যার যে ষড়যন্ত্র হয়েছিল, আবেগের আতিশয্যে মরলেন নিরীহ নগর দম্পতি। ছকে কোথাও ভুল ছিল কি? এই হঠকারিতার ফলে প্রফুল্ল চাকী এঁরা আগেই নিজের পিস্তল দিয়ে আত্মঘাতী হলেন। ক্ষুদিরাম দীর্ঘ ২৪ মাইল হেঁটেও পালাতে ব্যর্থ হলেন। তার পরের অংশ তো বাঙ্গালীর ঘরে ঘরে করুণগাথা হয়ে আছে। কী বলব মশায় বাবু?

মানুষটি তাঁর প্রচলিত বিশ্বাস থেকে সরতে পারছেন না, আবার যুক্তিও খণ্ডানো যাচ্ছে না। মশায় প্রসঙ্গ ঘোরাতে বলেন – ওই দ্যাখো, শীতের বেলা ক্যামোন দৌড়াচ্ছে। আমি উঠে বাবারা। সত্যিই সময় মাঝ দুপুরে এসে পড়েছে। মশায় হেমব্রমকে বিদায় জানিয়ে আমরাও উঠে পড়ি।

ছেন্দাপাথর ছেড়ে রানিবাঁধের সদরে সড়কে ফিরে এসেছি। পথের দ’ধারে ছেড়া জঙ্গল। তার ভাঁজে ভাঁজে গ্রাম – খর্দা, চেঙ্গাম, কদমাগড়, হলুদকাবালি। এই উড়ো যাত্রায় গাড়ি থামল একটা জঙ্গলের ধার ঘেঁষে।জায়গাটা নিশ্চিন্তইপুর। গ্রামটা ভিতর বাগে। ছত্রধর এক প্রৌড় সামনে এসে সুধোন – তোমরা কোন পথে দিশা খুঁজছো ভায়া? প্রথমেই ভদ্রলোকের সৌম্য চেহারা চোখ টানে। শান্ত, শালীন ব্যবহার। সব দিক বিচারে মনে হল শিষ্ট সংযত জীবনযাপনের ব্যাকরণ মেনে চলায় তিনি অভ্যস্ত। তাঁকে একটু বাজিয়ে দেখতে বলি – আমাদের দিশাহীন দিশায় ঘোরাটাই নেশা। 

ভদ্রলোক থমকান একটুক্ষণ। বলে ওঠেন – আরে দাঁড়াও ভায়া! এমন টগবগে ভবঘুরে তো দেখি নাই ইদিকে। তোমাদের ঠেক-ঠিকানা কোথায়? – আমরা সব শাঁখারিটোলা, কাঁসারিটোলা, আহিরিটোলার জীব। ভদ্রলোককে বিভ্রান্ত করতে বলে যাই তিনি মৃদু হেসে বলেন – বুঝেছি, তোমরা কলকাত্তাইয়া। হাতে সময় থাকলে চল আমার ঘরে। যুত করে বসে চা-গপ্পো হবে। 

তাঁকে বুঝিয়ে বলি, সময়কে ত্যাগ দিয়ে আমদের এই সফর। শহর ছেড়ে আসা মানে দুষণ নামক দুর্জন এবং ব্যতিব্যস্ত সময়, উভয়কে ছেড়ে আসা। বেশ করেছ। কিন্তু আপনার ঘরে গিয়ে উঠলে বিড়ম্বনা….। ভদ্রলোক হৈ হৈ করে হেসে ওঠেন। ঘরেতে দু’ভাই বোন। মাস্টার আর মাস্টারনি। ভদ্রলোক বলেন – আরও একটু শুধরে দিই- আমারা দু’জনেই প্রান্তিক চাষী। প্রাথমিক শিক্ষার প্রান্তে যে শিক্ষা, তাদের গড়নদার। তোমাদের ধারনায় সংসার, আমাদের বোঝায় সঙ-সার। অর্থাৎ, যার সারই অসার। আপনি দেখছি কথাশ্রী খেতাবযোগ্য ব্যক্তি। না হে, আমি শশীপদ সেন। তাঁর ঘরের পথে চলতে চলতে কথা হয়। 

রাঙচিতা বেড়া ঘেরা ভিঘে তিনেক জমি। তার মধ্যে মাটির দেওয়াল, টালির ছাদ – ছবির মত বাড়ি। সামনে–পিছনে বারান্দা।বাঁশের ফটক খুলে বাড়ির সীমানায় ঢুকে পরিবেশ ঘুরে দেখান শশীপদ। উঠোনের একপাশে মোরগঝুঁটি, কামিনি, কাঞ্ছন, শ্যামালতা। উঠোনের অনেকটা জুড়ে চাটাইপাতা। বাড়ির পিছনে কিচেন গার্ডেন – মাচায় লাউ, পুঁই, লতানো ডিংলা, বেড়ার গায়ে ঝিঙ্গার ঠোঁটে হলুদ ফুল। 

শশীপদ বলেন – অই যে চাটাই পড়েছে দেখছ,গায়ের কচিকাঁচারা আসে ফ্রি কোচিং নিতে। এটি আমার বোনের ব্যবস্থা। সকালে এক প্রস্থ, বিকালে স্কুল সেরে সেরে এসে পুনরায়। তখন উঁচু থাকের ছেলে-মেয়ে। সকালে এক পাত্র মুড়ি গুড় খেয়ে পড়তে বসা। ওই খাদ্যটি দুই কাজে লাগল – হরিজন শিশুদের পেট ভরল, গুড় মুড়ির টানে হাজিরা বাড়ল। আমার বোনের নেশা এটাই। আমার কাছে কাজটা ভারি মজার। আমরা দ’জনে স্কুল থেকে যা আয় করি, চলে গিয়ে বাকিটা ওদের কাজে লাগে। এতে সামাজিক জীব হিসেবে দায়পূরণ হল, মজাটাও উপভোগ হল। সেই মজাটা কী স্যার? সেটা সময়ে বলব। 

উঠোনের পাশে কঞ্চিতে বোনা – বেঞ্চ এ বসেছি।   ঘরে খবর গেছে চা এর। শশীপদ বলেন – আমরা আদিতে ও-পারের উদ্বাস্তু। দাঙ্গার গতিকে মা বাপ সম্পত্তি সমৃদ্ধি সব খুইয়ে কড়িফটকা হয়ে শুধু মাত্র শিক্ষাগত যোগ্যতার মালপত্রগুলি সম্বল করে এপারে এসে উঠলাম। এই নিশ্চিন্তিপুরে। 

এই স্কুলটির তখন নিতান্তই নাবালক দশা। আমাদের হাত হাত ধরে সবে উঠে দাঁড়াল। পরিবেশ কেমন ছিল স্যার? হঙ্গলের দম ছিল। চারদিকে হাতি, বন শুওর, সাপ, অতিস্টকর সব প্রাণী। সেই জঙ্গল তো এখন মাত্র তিরিশ ভাগে এসে ঠেকেছে। বসতি বেড়েছে। মানুষ বাড়লে অনুষঙ্গ বাড়ে। এখন এই যা দেখছ। শশীপদ বলেন – স্কুলের কথায় ফিরি – সেটি এখন মাধ্যমিক পর্যায়ে গেছে। পড়ুয়া বেড়েছে। স্কুলের মান বেড়েছে। এই ব্যবস্থা যেমন একদিনে হয়নি, বিনা পরিশ্রমেও হয়নি। শশীপদকে মনে করাই – আপনার মজার কথাটি শোনা হল না। তিনি বলেন – সেই কথায় তো আসছি ভাই।

কিছুটা সময় কথাহীন কেটে যায়। শশীপদ হঠাৎ প্রশ্ন করেন – তোমরা কেউ প্রতিমা শিল্পীর কাজ দেখেছ নজর করে? দেখিনি সেভাবে। তিনি বলেন- মূর্তি গড়ার প্রথম ধাপে লাগছে বাঁশ-চটা-খড়-দড়ি। প্রথম পর্বে মেড়া বাঁধা। তারপর মাটি পড়ল। অর্থাৎ দেবী শরীর ধরলেন। শুকোবার পর গোলা মাটির মাডুলি(লেপন) তার পরেতে রং চড়ল শরীরে। প্রতিমা তখনও জাগেননি। 

চক্ষু দানের পর দেবী জেগে উঠে প্রথম দেখলেন এই জগৎ সংসার। তিনি বুঝে নিলেন ভবের কি ভাব, আর ভবের অভাব। এবারে একই কায়দায় একটি আকাট অনক্ষর বালকের আন্দাজ নাও। যতদিন না তার সঙ্গে অক্ষরের সন্ধি হচ্ছে, সে অন্ধকার পিচ পাত্রে ডুবে আছে। যখনই সে জ্বর এবং ব্যাঞ্জনের ব্যাঞ্জনা শেষ করে আ-কার, উ-কারের আকারে যাবে, তার সামনে তিন তিন ভুবনের মহলে খুব গেল। কতগুলি অলীক রেখা বাগ্ময় হয়ে উঠল।

বালকটি এখন পড়তে পারে দোকানের নাম, বাসের ঠিকানা। সে গুনে ফেলে হিসেবের কড়ি, ধরে ফেলে মহাজনি কূটকাচাল। অনাদরে লালিত বালকটি আজ অক্ষরের ছোঁয়ায় মূল স্রোতে দাঁড়াবার অধিকার চায়। এই ম্যাজিকটাই আমার মজা।

চায়ের সঙ্গে এক থালা তড়াপের আনা মাছ ভাজা, পাপর নিয়ে হাজির হল এক ষোড়শী। শশীপদ বলেন- এটি হল আমাদের কেয়ারটেকার। বলতে পারো এই দুটি জীবন ও অধিগ্রহণ করেছে। তোর গুনপনা সব বল দাদাদের। মেয়েটি আনত মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। ওকে বলি, তুমি ভালো নাচ বুঝি। শশীপদ বলেন – ও ভালো বাহা নাচে। পাঁতা, ডম, ডাহারও নেচে দেয়। আর ওর হাতের সাঁড়ার(মোর্গা) কালিয়া দুরন্ত। 

নাম জানা যায়? ওর জাত-ঘরের নাম ছিল কৌশল্যা, সেটি বাতিল করে শহুরে নামের পোষাক পরিয়েছি – শ্যামা বাস্কে। পাশে সাঁওতাল পাড়ায় ঘর। বাবাটা ভেকুয়া মাতাল ছিল, মদে ডুবেই মরল। মা’টা একদিন কেঁদে পড়ল- বিটিকে তুমার হেথায় ঠাঁই না দিলে শৃগাল, হুড়াল লুটে খাবে। জীব জন্তর খবরাখবর আমরাও পাচ্ছিলাম। বোন বলল, মেয়েটাকে নিয়েই আসি দাদা। সেই থেকে শ্যামা সংসার করে, স্কুলেও যায়। আট ক্লাসে পড়ছে। আপ্নারা দেখছি জঙ্গলে বসে অ-সহজ কাজ কত সহজে করছেন। এ কাজ সহজ হয় না বাবু। ওই যে বললাম, বাগিচায় ফুল গড়তে ভালবাসি। তবে কথাটা জেনে যাও – মূর্খদের স্বর্গে বাস করলে, সে কাজটাও খুব সরল নয় হে।

প্রসঙ্গ ফেরাতে বলি – স্যারের সঙ্গে তো পরিচয় হল, তাঁর বোনের সঙ্গে আলাপ হল কই? শশী মাস্টার সহাস্যে বলেন, আজ রবিবার, বোনের ব্যস্ততা চৌগুনা। খুর্দা, ঢেঙ্গাম পার করে তার সাইকেল এখন শ্যামসুন্দরপুরের জঙ্গল ধরেছে। এই দিন্টা জনসংযোগের। কোনও এনজিও অথবা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত বুঝি? শশীপদ বেশ রাশভারি গলায় বলেন – কেন? নাগরিকের নিজের কোনও দায় নেই এই সমাজটার প্রতি? সব কাজেই পার্টি, সরকার, প্রশাসন, নেতা কেন হবে? আমাদের সব কাজের উপর শুনেছি অনেকের নজর কড়া। আর আমাদের নজর নিচের থাকের মানুষের সুখ অ-সুখের দিকে। 

পিছিয়ে থাকা মানুষগুলির মুস্কিল আসান করে এগিয়ে আনার চেষ্টা করা। সাহস জোগানো। মোদ্দা হল- ‘অন্ধ জনে দেহ আলো, মৃত জনে দেহ প্রাণ।’ এই যে উজিয়ে এসে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, যাদের নীতিই হল–‘অন্ধজনে অন্ধ কর, মৃত জনের লো প্রাণ’ তারা আপনাদের ছাড়বে ভেবেছেন!’ সেটা গ্রামের মানুষ বুঝবে –কে আছে তাদের কাছে, আর কে মিছে। সে জন্যেই প্রয়োজন শিক্ষার। 

আরে একটা চারপেয়ে পোষ্য বোঝে আপন পর, শিক্ষার আলোকপ্রাপ্ত মানুষ বুঝবে না? শশী মাস্টার উত্তেজিত গলায় বলে চলেন – রমলা সেন, অথবা শশীপদর গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠি ওদের বিশ্বাস, যার অনেকটাই মানুষ অপচয় করেছে বলে আজ বুঝতে পেরেছে। মাস্টার কথার তোড়ে ঠান্ডা চা গলায় ঢেলে ঠকাস করে কাপটা রেখে বলেন, আগামী বছর তিনের মধ্যে আমরা দু’জনেই অবসর নিচ্ছি। তখন সবটা ওদের দিতে পারবো আশা করছি। 

ওদের এখনও বোঝাতে হবে- চতুরের সঙ্গে লড়তে হলে চালাক হতে হবে। সত্যের প্রতি অবিচল থাকা। প্রলোভনকে ঘৃণা করা। কায়েমি স্বার্থের সঙ্গে  সর্বপ্রকার সংঘাতে সংগঠিত শক্তি চাই। শরীরী গঠনতন্ত্রে শিশু মন, আর প্রাপ্তবয়স্ক মনে যেমন ফারাক, তার রোগের দাওয়াই ভিন্ন। সঠিক পথটা বাৎলে দিলে মানুষগুলি লড়াইয়ের সাহস ও শক্তি নিজেরাই অর্জন করে নেবে। 

শশী মাস্টারের কথাগুলি মনের মধ্যে শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ছাড়ল। ও-পার থেকে নিঃসম্বল হয়ে আসা দুই ভাইবোন এ পারের দুর্গম জঙ্গলে ডেরা করে নিজেদের উপার্জনের অধিকটাই বিলিয়ে দিচ্ছেন একটা কঠিন লক্ষ্যে পৌঁছবার স্বার্থে। যেন এক দারুশিল্পী, যিনি র‍্যাদা, ভোমর, তূরপুন চালিয়ে নীরস কাষ্ঠখন্ডকে মনুষ্য অবয়বে রূপান্তর ঘটিয়ে, ছেনি বাটালিতে কুঁদে একটি পেলব শিল্প বার করে এনে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন। এ এমনই এক খেলা, যে বেনিফিট ম্যাচে একজনের ইচ্ছে শক্তির কাছে তাঁর অস্তমান বয়সের ডাহা পরাজয়। জীবনের এই পাঠ মাথার মধ্যে খোদাই করে দিলেন শশীপদ সেন। 

বেলা ফুরোচ্ছে। পথে এবারে হাতির নড়াচড়া শুরু হবে শুনে উঠে পড়েছি। শশী মাস্টার একটু বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন – আশ্রমটি তো দেখে গেলে ভাই। অবকাশ পেলে চলে এসো। এখানে এসে পড়লে মনের শুশ্রুষা, দেহেরও আরাম। তার থেকেও বড় কথা, এইসব মানুষের স্বার্থে কাজ করতে তোমাদের যে প্রয়োজন ভাই। 

কথাগুলো বিনা মন্তব্যে শুনলাম, এবং মানুষ গড়ার ঈশ্বরকে বিদায় জানিয়ে গাড়িতে চড়ে বস্লাম। গাড়ি চলল। পিছন ফিরে দেখি একটি হাই ভোল্টেজ পাওয়ার হাউস ক্রমশ ধূসর হয়ে মিলিয়ে গেলেন বটে, কানে বাজতে তাঁর কথাগুলি – ‘মানুষের স্বার্থে তোমাদের প্রয়োজন। ভেবে দেখো ভাই।’ তাঁর নিস্ফল প্রতীক্ষায় বিষন্ন বোধ হল। 

মনে মনে বলি – শহরের এই বর্জ্যকে গ্রাহ্য করে বড় ভুল করে বসেছেন স্যার! আমাদের প্রয়োজনের দুনিয়া যে ভিন্ন, সেখানে আপনার আবেগের কোন মূল্যই নেই। এই সত্যটা আপনাকে জানিয়ে আসতে পারলাম না; আমাদের ক্ষমা করে দেবেন।   

জগন্নাথ ঘোষ
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক। অরণ্য পথিকও বলা যায়। মানুষের মর্ম সন্ধানী এক ভবঘুরে ।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here