Thailand: থাইল্যান্ড ভ্রমণ

0
75

বেড়াবার শখ আছে ঠিকই, তবে বিদেশ ভ্রমণ হবে এমন তো কখনও ভাবি নি। আমার ধারণা সবার জীবনেই কিছু না কিছু সুযোগ আসে, তা কাজে লাগালেই সাধ মেটে। আমরাও সুযোগ পেতেই বেরিয়ে পড়লাম থাইল্যান্ডের উদ্দেশ্যে।

বিদেশ যেতে প্রথম দরকার হয় পাসপোর্ট। সেটা করানো নিয়ে ভয় ছিল, কিন্তু খুব সহজেই হয়ে হলো। এক টাকাও ঘুষ লাগে নি। এবার দরকার একটা প্লেনের টিকিট, তাও পেয়ে গেলাম। এবার দরকার ভিসা- মানে যে দেশে যাবো সে দেশে ঢোকা ও থাকার অনুমতিপত্র। থাইল্যান্ডের ভিসা সেখানে উপস্থিত হয়ে বিনা পয়সাতেই হয়। একে বলে অন অ্যারাইভাল ভিসা। তবে আমাদের পরামর্শদাতা বলেছিলেন – পাশে প্রায়োরিটি কাউন্টার থেকে ২০০ ভাট দিয়ে ভিসা করাতে। টাকাও বদলে নিলাম। ২.১ টাকায় এক থাই ভাট।

প্লেনযাত্রা আমার বিরক্তিকর লাগে। ২ ঘন্টা আগে গিয়ে চেকড লাগেজে মাল দিয়ে বোর্ডিং পাস নিয়ে খাঁচায় বন্দী হয়ে বসে থাকা। এক কাপ চা খেতে গেলে ৫০ না ১০০ টাকা লাগবে তা জানা নেই। আরও বিরক্তিকর যদি ফ্লাইট রাতে হয়। চোখে ঘুম, ঘুমানো যাবে না, পেটে ক্ষিধে – খাওয়া যাবে না। জলের যে কি নিয়ম তা আজও বুঝলাম না। কল আছে জল খাবার, তবে তা উর্দ্ধমুখী। যা হোক, সব দুঃখেরই শেষ আছে, বিরক্তির শেষ হলো ব্যাঙ্ককের সুবর্ণভূমি এয়ারপোর্টে নামতে।

নেমেই দৌড়, লম্বা পথ পাড়ি দিতে হলো। তবে ফ্লাট এস্কালেটর কিছুটা সুবিধা দিয়েছে। ভিসা কাউন্টারে খুব ভীড়, স্ত্রীকে দাঁড় করিয়ে এদিক ওদিক দেখছি, হঠাৎ হাঁক শুনলাম – তু হান্দ্রেদ ভাত ভিসা – দিস কাউন্টার।

এক দৌড়ে সেই কাউন্টারের মুখে। কাউন্টার একেবারে ফাঁকা। আমি সব প্রয়োজনীয় কাগজ গুছিয়েই রেখেছিলাম ফাইলে, পরপর দুটো গোছা ঢোকালাম, ওতে ছিল পাসপোর্টের ছবি আর লেখা অংশের কপি, টাকা বদলানোর কাগজ আর বুকিং স্লিপ, সাথে পাসপোর্ট আর চারশো ভাট। মধুর বাণী ফেরত এলো – গো ব্যাক সাইদ। আমি এদিক ওদিক দেখছি, হাঁক দেওয়া ছেলেটি আমাকে প্রায় ধরে নিয়ে ইমিগ্রেশনে, সেখানে ক্যামেরাতে বদন আর চোখের ছবি দিয়ে আবার পাসপোর্টে ছাপ্পা পেলাম – মানে চলো থাইল্যান্ডের অন্দর।

লাগেজের জন্য গেলাম, সহজেই পেলাম আমাদের একমাত্র ট্রলি সুটকেস। চারদিকে তাকালাম বিজয়গর্বে। আমাদের দলের মাত্র দু’জনকে দেখলাম, তারা ভারত থেকে ভিসা করে এনেছে।

দলের অনেকে সিমকার্ড নিলেও আমি নিলাম না, পরে দেখেছি তা খুব মন্দ হয় নি। পরিষ্কার হয়ে গাইডের সাথে বাসে। দোতলা বাস দেখে খুব ভালো লাগল – পুরোনো কলকাতাকে মনে পড়ে গেলো। সোজা উঠে দোতলাতে জায়গা নিলাম। ক্ষিধেতে পেটে ছুঁচোর ডন, তবু চুপচাপ বসে বিদেশ দেখছি আর চলছি। ভোরের রাস্তা ফাঁকাই, পরে থাইল্যান্ডের জ্যাম টের পেয়েছিলাম।

ঘন্টা কয়েক যাবার পরে গাড়ি থামল। আমরা নেমে গাইডের নির্দেশে হাত মুখ ধুয়েই ঢুকে পড়লাম এক রেস্টুরেন্টে। গাইড জামাতে টিকিট মেরে দিলো, তার জোরে আমরা যা খুশী খাবার খেলাম। এলাহি বুফে। ভাত, ফ্রায়েড রাইস, লুচি, পাঁউরুটি – কিছুরই অভাব নেই। ডাল, তরকারি, চিকেন আর হ্যাম, ডিম আছে, আছে তিনরকম ফল, চা, কফি – কুকিস আর ঠান্ডা পানীয়। একেবারে যাকে বলে গান্ডে পিন্ডে খেয়ে ১৪ ঘণ্টার অনশন ভাঙলাম। 

থাইল্যান্ডের আয়ের প্রধান অংশ ট্যুরিজিম থেকে আসে। একদা মার্কিনদের সামরিক ঘাঁটির এই দেশে কৃষি বা শিল্প কোনটাই তেমন মজবুত হয়নি। তাই ভিয়েতনাম যুদ্ধে হেরে মার্কিনরা যখন ইন্দোচিন থেকে সৈন্য তুলে নিল তখনই থাইরা বিপদে পড়ে ট্যুরিজিমকে আঁকড়ে ধরলো। ওদের থেকে ট্যুরিজিম শেখার আছে। আলিপুর চিড়িয়াখানায় ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে বসার জায়গা খুঁজলে তাকে আরো ক্লান্ত হতে হয়। পেলেও তা গন গনে রোদ্দুরে। 

ওখানে সুন্দর ছায়ায় বসার জায়গা, এপ্রিলের গরমের দিনে ফোয়ারা ছেড়ে বাতাস ঠান্ডা করার ব্যাবস্থা, জলের কল, টয়লেট। একটা রেস্টুরেন্টে কয়েক শো লোককে বসে খেতে দেখেছি –সব বুফে। ট্যুরিস্টদের পকেট থেকে পয়সা বার করারও হরেক ব্যবস্থা। বাঘকে দুধ খাওয়াবে? ৮০০ ভাট। বাঘের সঙ্গে ছবি তুলবে? ৪০০ ভাট। হাতির শুঁড়ে উঠে ছবি ওঠাবেন? সমুদ্রের জলের নিচ দিয়ে হাঁটা আর শুশুকদের খাওয়ানো, বেলুনে ওড়া, ওয়াটার স্কুটার, স্পিডবোট রাইড – কী নেই! শুধু ভাট ফেললেই হলো। 

আমরা ব্যাঙ্কক আর পাটাওয়াতে যে দুটো হোটেলে ছিলাম তা ছিমছাম, ব্যবস্থা নিঁখুত। আমরা বেরিয়ে যাবার পরে সুন্দরভাবে ঘর সাফ করে গুছিয়ে দিয়েছে। রোজ একজোড়া করে কাচা ধবধবে তোয়ালে, ছোট দু’শিশি শ্যাম্পু আর ছোট দুটো সাবান রেখে দিয়েছে। পাটাওয়ার হোটেলে সুইমিং পুলো ছিল। রাস্তাতে গাড়ি অকারণে হর্ণ বাজায় না, আমাদের বাস পাঁচ দিনে ছ’বার দিয়েছিলো। পথচারীরা ফুটপাথ দিয়ে হাঁটে, যেখান সেখান দিয়ে রাস্তা পার হয় না। রাস্তায় ময়লা বিশেষ নেই, অকারণে চেঁচামেচিও নেই। ট্রাফিক পুলিশ নেই, সর্বত্র সিসি ক্যামেরা।ঠকবাজি খুব না থাকলেও পিক পকেট আছে।

দুটো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখেছি – ভালো লাগেনি। সব থেকে খারাপ লেগেছে যখন শোয়ের শেষে স্বল্পবাস অভিনেত্রীরা বাইরের চাতালে এসে দর্শকদের ডাকছিলো – কাম, ফোতো, মানি। থাইল্যান্ডের স্পা বিখ্যাত, তবে স্পা-এর আড়ালে আরও কিছু হয় বলে দুর্জনরা বলে।

থাইল্যান্ডের বিচ পরিষ্কার, স্নান করা যায়। বিনোদনের নানা ব্যবস্থাকে সামনে এনে প্রকৃতিদেবী পিছনে ম্লানমুখে দাঁড়িয়ে। এখানে আমাদের আন্দামান ওদের কান কেটে দেবে। সেই কেয়ার ঝাড়, পড়ে থাকা নারকেল, সুপারি বন ওদের বিচে নেই। তবে ব্যবস্থা পরিপাটি।

ব্যাঙ্ককে মার্কেট এরিয়াতে কিছু হিন্দি চলে। উগ্র গন্ধের কিছু সাবান ছাড়া উল্লেখ করার মতো কিছু পেলাম না। হকার আছে প্রচুর, দরদাম বেশ হয়। ভীড় খুব, স্পা-এর দোকানের মেয়েরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ডাকাডাকি করছে, দো’তলা তিন তলা রাস্তা থাকলেও জ্যাম হয় প্রচুর। থাইল্যান্ডের বেশীরভাগ মানুষই নাকি এখন পেটের দায়ে ব্যঙ্ককে এসে হাজির হয়েছে।

ট্যুর হয়েছে সকাল থেকে রাত অবধি। হোটেলে সকালে স্নান খাওয়া সেরে বার হয়ে রাতে খেয়ে সাধারণত ঢুকেছি। কষ্ট হলেও দেখার আনন্দ অনেক।

ফেরার প্লেন যাত্রা আরও বিরক্তিকর হলো। থাই ইমিগ্রেশনে কতগুলো ফচকে ছুঁড়ি খালি হি হি করে হাসে। আমাদের জুতো পর্যন্ত খোলালো। ইমিগ্রেশন পার হতে আর ফ্লাইট কোথায় খুঁজে বার করতে কিলোমিটার দু’য়েক হাঁটলাম। 

তারপরে, যেখানে স্থান পেলাম, সেখানে বসার জায়গা গুটিকতক, জল, টয়লেট অনেক দূরে। সারাদিনের ক্লান্তি দু’ চোখে নিয়ে অধীর অপেক্ষাতে। প্লেন ঘন্টাখানেক লেট। সুযোগ পেয়েই প্লেনের সিটে বসে দু’ প্যাকেট বিস্কুট ধ্বংস করলাম দু’জনে। তারপরে বিমানবালাদের দেওয়া জল পানে শান্ত হয়ে ঘুম। 

সাত সকালে ফাঁকা ইমিগ্রেশনে গটগট করে বার হলাম। লাগেজ নিয়ে বেরিয়েই পশ্চিমবঙ্গ – ৫ কিমি রাস্তার জন্য ট্যাক্সি হাঁকলো পাঁচশো টাকা। এগোতেই আরেকজন।এবার তিনশোতে। তাই চল বাবা। হোম সুইট হোম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here