বিন্দুকে দেখা

0
63

জন্মেছিলাম উত্তরে, কার্সিয়াং(Kerseong) শহরে, বাবার চাকরির সূত্রে থাকতাম তখন। হিমালয়ের কোলই তাকে বলব তাই না? তাই বোধ হয় উত্তরের হাওয়া এত টানে। পরের দিকে, এমনিতেই আমার চাকরি ও অন্যান্য পেশাদারী সূত্রে উত্তরে আনাগোনা বেড়েছে। এখন নিজেকে আমি ‘উত্তরের মেয়ে’ বলে ভাবতে ভালই লাগে। উত্তরবঙ্গ(North Bengal) এর সঙ্গে প্রাণের যোগ এখন পরিণত হয়েছে অভ্যাসে। প্রতিবারই ট্রেন যখন কিষানগঞ্জ(Kisengaunj) পেরোয়, তখন মনের মধ্যে বোধহয়, আমার নিজের কিছু যেন আবার আমার নিজের করে পাওয়ার সময় এসেছে |

কীভাবে যাবেনঃ শিয়ালদহ(Sealdah) থেকে রাত ৮-৩০ মিনিটের কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস। পৌঁছবেন পরের দিন বেলার দিকে মাল জংশনে। ওখান থেকে গাড়ি বুক করতে হবে। ভাড়া নেবে দেড় হাজারের মত। আবার নিউ জলপাইগুড়ি(New Jalpaiguri) স্টেশনেও নামতে পারেন। ওখান থেকে গাড়ি ভাড়া করতে হবে। বিন্দুর দুরত্ব ১০৭ কিমি। আর মাল জংশন থেকে ৪৫ কিলোমিটার। আমি মাল থেকেই গাড়ি করেছিলাম।
বিন্দুর কথা বলতে গেলে নিজের সম্বন্ধেই কিছু বলা। প্রথম যেবার যাই সেবার সামসিং(Sansing) গেস্টহাউসে উঠেছিলাম। সেখান থেকে বিন্দুর পথে রওনা দেওয়া। মনে পড়ে, মালবাজার(Malbazar) থেকে যখন বিন্দুর পথে, তখন আগাম ভাবনায় বিশেষ কিছু ছবি ছিল না বলেই মনে পড়ছে। কী আর এমন জায়গা! মংপং এর আদলেই তো চারদিকে। খানিক যাবার পর মনের মধ্যে পাহাড়ি-দৃশ্য (Bindu)যখন মনে বিছিয়ে গেছে, কোনও নরম হাতে বোনা চাদরের মতন, মনে পড়ে তখনকার অনুভুতি হৃদয়কে এক মোহময় আবেশে আচ্ছন্ন করে দিয়েছিল। রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে দেখেছিলাম, পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা ঝরনার ধারাগুলো পাহাড়ি পথকে ভিজিয়ে দিয়ে চলেছে। প্রতিবারই মনে হচ্ছিল গাড়ি থকে নেমে, নিজেও একটু ভিজে নিই। কিন্তু উত্তেজনাকে দমন করতে হয়েছিল আমার ছোট্ট মেয়ের কথা ভেবে। কারণ, পাক খেয়ে খেয়ে ওঠা গাড়ির ডিজেলের গন্ধে ওর বেশ কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু ওই-টুকু বয়সেই মায়ের চোখে-মুখে উত্তেজনার ও কী বুঝেছিল কে জানে! অনুভব করতে পেরেছিল কিছু, ওই বয়সে? কিছুক্ষণ পর ঘুমিয়ে পড়েছিল তাও মনে আছে।
Beautiful Dooars

ঝালংযের(Jhalong) কোল ঘেঁষে বয়ে চলেছে জলঢাকা(Jaldhaka) নদী। ভাল লাগছিল, খুব নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া জলঢাকা নদীর আঁকাবাঁকা গতিপথ। যে পথ আমাদের সঙ্গে-সঙ্গেই এগিয়ে চলেছে বিন্দুর(Bindu) দিকে। একটা সময়ে যখন ঝালংযে পৌঁছলাম সামনে জলঢাকা ব্রিজ। জলঢাকা যেন দুরন্ত গতিতে উপচে পড়ছিল। আমি নির্বাক হয়ে গিয়েছিলাম। বুঝতে পারছিলাম, আমার পা ওখানেই আটকে গেছে। জলের ওই তীব্র স্রোত এ-পর্যন্ত আমার দেখা সমস্ত অনুভূতিকে ছাপিয়ে গিয়েছিল। এরপর যখন বিন্দুর উদ্দেশ্যে আবার এগোতে লাগলাম তখন, মনের মধ্যে আরো চমক তৈরি হতে লাগল, সেই সঙ্গে দ্বন্দ্বঃ আকীর্ণ অরন্য, পাহাড়ি বসতি, জীবন ও ফেলে দেওয়া বিয়ার ও মদের বোতল- পাহাড়ি পথে ছোট গ্রাম প্যারেন হয়ে ভুটান(Bhutan) সীমান্তে ভারতের(India) শেষ জনপদ বিন্দু। পথে পড়ল ঝালং-এর জলঢাকা হাইডেল পাওয়ার প্রজেক্ট। প্যারেনের(Paren) রঙিন রঙিন কাঠের ঘরবাড়ি। আর পথের ধারে কমলার বাগান। ছবির মত পাহাড়ি গ্রাম বিন্দু। বারান্দায় টব আলো করে আছে ফায়ারবল, পিটুনিয়া, গ্ল্যাডিয়োলা আর অর্কিডের ফুল। বিন্দুতে জলঢাকা ব্যারেজের ওপারে ভুটান। বাঁধের ওপর পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়াচ্ছে দু’একজন। কিন্তু তখনই দেখলাম, একজন ছবি তুলতে যেতেই রে রে করে কোথা থেকে বৃদ্ধ প্রহরী ছুটে এসে বাধা দিল, তার মানে ছবি তোলা যাবে না।

Slow Shutter
Tea Garden
সামসিং(Samsing) গেস্ট হাউসে পৌঁছতে পৌঁছতে বেশ বেলা হয়ে গিয়েছিল। এরপর স্নান সেরে গরম গরম ভাত, আলুভাজা, ডাল আর মুরগির মাংসের ঝোল খিদের মুখে খুব ভাল লাগল। সন্ধ্যার একটু আগে বেরোলাম। বিন্দুতে জলঢাকা ব্যারেজের ওপারে ভুটান। অনেকেই পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ান। হেঁটে আসা যায় ওপারের ভুটানের চৌহদ্দি থেকেও। সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার, হাট বসার দিন। হাট বারে ওপার অর্থাৎ ভুটানের মানুষ দলে দলে বিন্দুতে বাজার করতে এসেছেন। সপ্তাহের এই দিনটাতে সব রাজনৈতিক সীমারেখা যেন মুছে গেছে। আবার বুধবারে ১৩কিমি দূরে ঝালং-এ বাজার বসে।
যাই হোক, সব ভালর মধ্যেও আমাকে বেশি টেনেছিল বিন্দুর পাহাড়ি নদী। বড় বড় পাথর, ব্যারেজ থেকে জল মাটিতে আছড়ে পড়ার প্রচন্ড উচ্ছ্বাসে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল তাতে- তখনকার মত সেটা ছিল আমার দেখা সেরা পাহাড়ি নদীর রূপ। মনের মধ্যে অনেক কিছুই ছিল ইচ্ছে হয়ে, সব ইচ্ছেকে প্রকাশ করা যায় কি? তাই আপাতত জলে পা ডুবিয়ে থাকার ইচ্ছেটাকে তখনকার মত প্রশ্রয় না-দিয়ে আর পারি নি। মনে পড়ে, জলে পা-দিতেই ঠান্ডা জলের স্পর্শে মনে হল আমার কত গ্লানি, কত না-মেলানো হিসেব সব যেন জলের তোড়ে ভাসিয়ে দিয়ে অন্ততঃ দু’দিনের জন্য মুক্তি পেলাম।

কোথায় থাকবেনঃ আগেই বলেছিলাম আমার গেস্ট হাউসে থাকার কথা। তবে বিন্দুতে সরকারি গেস্ট হাউসের চেয়ে বেসরকারী হোটেলের ওপরে ভরসা করাই বেশি ভাল। না,ওখানে এখনও সেরকমভাবে হোম স্টে গড়ে ওঠেনি। আর একটু দূরে ঝালং-এ থাকতে গেলে আছে সরকারী ব্যাবস্থায় তাঁবু, বেসরকারী গেস্ট হাউস ও বেসরকারী হোটেল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here