আকাশে বাতসে পুজো পুজো গন্ধ। কিন্তু পুজোর ছুটির মজাটাই এবার মাটি হয়ে গেল পাঁজি করোনার জন্য। কত দিন স্কুল যাই নি। বন্ধুদের সাথে দেখা হয় নি। চব্বিশ ঘণ্টা বাড়িতে। মন খুব খারাপ। মনে হচ্ছে এখনই কোথাও বেড়িয়ে আসি। কিন্তু উপায় নেই। সেবার পুজোর ছুটিতে কী আনন্দটাই না হয়েছিল হিমাচলে(Himachal) বেড়াতে গিয়ে। আজ আমি সেই গল্পই বলবো।  
 
 
আমি, বাবা ও মা তিনজনে হিমাচল বেড়াতে গিয়েছিলাম। শিয়ালদা(Sealdah) থেকে রাজধানী ট্রেন সন্ধ্যায় ছাড়ল। কী সুন্দর ঝকঝকে কামরা। পরের দিন সকাল দশটায় নয়াদিল্লি(New Delhi) স্টেশন। তারপর বিকেলে কালকা-শতাব্দী এক্সপ্রেস ট্রেনে চেপে কালকা। রাত তখন ৯ টা। রাতে কালকা(Kalka) স্টেশনে রিটায়ারিং রুমে ছিলাম। বিশাল ঘর। বাবা আগে থেকেই বুক করে রেখেছিল।
পরের দিন সকালে আমরা যাব শিবালিক টয় ট্রেনে সিমলা(Shimla)। আমি তো আনন্দের চোটে ভোর ভোর উঠে বাবা-মাকে ডাকাডাকি শুরু করে দিলাম। রেডি হয়ে যে প্ল্যাটফর্মে শিবালিক টয় ট্রেন ছাড়বে সেখানে গেলাম। ট্রেন ছাড়ার কথা সকাল ৫টা৫০-এ। কিন্তু হাওড়া-কালকা ট্রেন দেরিতে আসায় টয় ট্রেন ছাড়ল প্রায় তিন ঘন্টা দেরিতে। আমার তখন খুব রাগ হচ্ছিল। কিন্তু কী আর করা যাবে। 
 
 
টয় ট্রেনের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুললাম। টয় ট্রেনটা দেখতে অনেকটাই আমার খেলনা ট্রেনটার মতো। আমরা সামনের কামরায় উঠে পড়লাম। ট্রেনে উঠে আমার খুব ভালো লাগছিল। মোটা গদিওয়ালা বসার সিট, কাঁচের জানালায় সুন্দর রঙিন পর্দা ঝুলছে। কিছুক্ষণ পর ট্রেন চলতে শুরু করল। ট্রেনের মধ্যেই খেতে দিল। আমি খেলাম ব্রেড ওমলেট ও ফ্রুট জুস। পাহাড়ের আঁকেবাঁকে ছোট বড়ো গাছের সারি। কোথাও কোথাও পাহাড়ের ভেতর থেকে ঝিরিঝিরি ঝরণার শব্দ। আমার মনে হচ্ছিল ছুট্টে যাই ঝরনার কাছে। অনেকগুলো ছোট ছোট স্টেশন ও সুরঙ্গ পেরিয়ে দুপুরে পৌঁছে গেলাম সিমলা স্টেশন। ট্রেন থেকে নামার সময় মনটা কেমন করছিল।

চারিদিকে কত লোক ব্যাগ নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছে।দেখি জগৎ আঙ্কেল আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আমরা আমাদের জিনিসপত্র নিয়ে জগৎ আঙ্কেলের গাড়িতে উঠলাম। জগৎ আঙ্কেল আমাদের সিমলা ঘোরাবে। আমরা সবাই হোটেলে পৌঁছালাম। স্নান করে লাঞ্চ খেয়ে একটু রেস্ট নিয়ে আমরা বিকেলে সিমলা শহর ঘুরতে বের হলাম। প্রথমে গেলাম সিমলা কালীবাড়ি(Shimla Kalibari)। অনেক উঁচুতে সিমলা কালীবাড়ি। আমি তো ফটাফট উপরে উঠে যাচ্ছি। কিন্তু বাবা ও মা উঠতে গিয়ে হাঁফিয়ে যাচ্ছে। অনেক কষ্টে বাবা-মা উঠল। তারপর আমরা তিনজন কালীবাড়ির ভেতরে ঢুকলাম। মন্দিরের ভেতরে কালী ঠাকুরের প্রতিমা। বারান্দায় ঘন্টা ঝুলছে। তখন সন্ধ্যারতি হচ্ছিল। কালীবাড়ি থেকে সিমলা শহরটা দেখতে খুব সুন্দর লাগে। চারিদিকে আলো ঝলমলে। অনেকক্ষণ বেঞ্চিতে বসে এই সুন্দর দৃশ্য দেখতে লাগলাম। তারপর কালী ঠাকুরকে প্রণাম করে নীচে খেতে গেলাম। মন্দিরের ভেতরেই খাওয়ার ব্যবস্থা। আমিষ, নিরামিষ সবই আছে। বাবা খাবার অর্ডার দিল। তারপর এক কাকু খাবার দিয়ে গেল। আমরা নিরামিষ খেয়েছিলাম। তারপর মন্দির থেকে বেরিয়ে আস্তে আস্তে নীচের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। নীচে রাস্তায় জগৎ আঙ্কেল গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল। গাড়িতে উঠে সোজা হোটেল। গরম জলে হাতমুখ পরিষ্কার করে কম্বল মুড়ি দিয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি।

 পরের দিন সকাল সকাল বেরিয়ে পড়েছি। প্রথমেই গেলাম সিমলা ম্যালে। বিরাট বড়ো। খুব সুন্দর জায়গা। ম্যালে ক্রাইস্ট চার্চের(Christ Church) ভেতরে যিশুখ্রিষ্টর সামনে দাঁড়িয়ে ভক্তিভরে নমস্কার করলাম। তারপর চার্চের বাইরে এসে  হিমাচলের পোশাক পরে ছবি তুললাম। ফটোগ্রাফার আছে। ওদের কাছেই পোশাক পাওয়া যায়। খুব ভালো লাগছিল।    
 
 
 
এবার গাড়ি করে চললাম কুফরি(Kufri)। কুফরিতে ভেতরে যাওয়ার উঁচু রাস্তা খুবই খারাপ। বড়ো বড়ো পাথরে ভর্তি। ঘোড়ার পিঠে চড়ে যেতে হয়। মা তো কিছুতেই ঘোড়ায় উঠবে না। তিনটে ঘোড়া। সব আগে বাবা একটা ঘোড়াতে উঠে বসলো। আমারও খুব ভয় করছিল। যদি পড়ে যাই। বাবার দেখাদেখি আমিও সাহস করে উঠে বসলাম। আমার ঘোড়াটি ছিল ছোট্ট আর খুবই কিউট। নাম লক্ষ্মী। এবার মাও উঠে পড়ল। সামনে বাবা, পেছনে মা আর মাঝখানে আমি। সহিসকাকু বলল, যখন উপরে দিকে যাব তখন সামনের দিকে একটু ঝুঁকে থাকতে আর ঢালু রাস্তায় পেছনে একটু হেলে থাকতে। এই প্রথম ঘোড়ায় চড়ছি। মজাও লাগছে আবার ভয়ও করছে। এবার ঘোড়াগুলো চলতে শুরু করল। খটাখট খটাখট। বেশ কিছু পথ যাওয়ার পর আর ভয় লাগছিল না। হঠাৎ দেখি রাস্তার পাশে বিশাল খাদ। আমার দম বন্ধ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর দেখি আর খাদ নেই। এবার মনে সাহস আরও বেড়ে গেল। পৌঁছে গেলাম কুফরি। চারিদিকে পাহাড়। মাঝখানে নীচু জায়গা। মা বলল, এই নীচু জায়গাকে উপত্যকা বলে। এদিক ওদিক বেশ কয়েকটি মন্দির আছে। খেলনার দোকান, খাবারের দোকান। ইয়ক দেখলাম। ইয়া বড়ো শিং। গোটা গায়ে বড়ো বড়ো  লোম। এক দাদু ভুট্টা বিক্রি করছিল। ভুট্টা কিনে খেতে খেতে চললাম সামনের দিকে। একজন বলল, সামনে আপেল বাগান আছে। হাঁটতে হাঁটতে পা ব্যথা হয়ে গেল। আপেল বাগানের দেখা নেই। বাবা বলল, এখানে তো একটাও আপেল গাছ নেই । মা বলল, চলো আর একটু এগিয়ে দেখি। বেশ কিছু পথ হাঁটার পর দেখি একটা ছোট্ট আপেল বাগান। গাছে গাছে আপেল ঝুলছে। কোনটা লাল কোনটা সবুজ। কী সুন্দরই না লাগছে। আমি তো লাফালাফি শুরু করে দিলাম। বাগানের ভেতরে ঢুকে গেলাম। গাছে গাছে আপেল আর আপেল। খুব নীচুতে একটা লাল রঙের আপেল ঝুলছিল। আমি সেই আপেলে হাত দিতেই পাহারাদার বলল, আপলোক সেভ মাত তোরিয়ে। আমি সঙ্গে সঙ্গে হাত সরিয়ে নিলাম। বাবা বলল, ঠিক হ্যায়। এবার গাছের পাশে দাঁড়িয়ে ফটাফট কয়েকটি ছবি তুললাম ক্যামেরায়। মা খুব ভালো ছবি তোলে।  ক্যামেরা হাতে মা সব সময়। তারপর বাগান থেকে বেরিয়ে পড়লাম। বাগানের বাইরে এক আন্টি আপেল বিক্রি করছিল। তার সঙ্গে কথা বলতেই বুঝতে পারলাম যে তার কাছাকাছি কোথাও বাড়ি। ঝুড়ির মধ্যে একটা সবুজ আপেল দেখতে পেয়ে ওটাই খাব বললাম। আন্টি ওই আপেলটা ছুরি দিয়ে কেটে একটু নুনমশলা মাখিয়ে দিল। মুখে দিতেই দারুন স্বাদ। কী মিষ্টি। বাবা ও মা লাল আপেল খেল। এবার ফেরার সময়। হেঁটে ঘোড়াগুলোর কাছে ফিরে আসলাম। ঘোড়াগুলো তখন খাচ্ছিল। খাওয়া শেষ হতে না হতেই সহিসকাকুরা ঘোড়াগুলোকে পরপর সাজিয়ে লাগাম পরিয়ে দিল। ঘোড়ার পিঠে আবার চড়ে বসলাম। ঢালু এবড়োখেবড়ো রাস্তা। পাথরে ভর্তি। পেছনের দিকে হেলান দিয়ে আছি। নামার সময় বেশি ভয় লাগছিল। ঘোড়াগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল, ” ইস! ওদের কী কষ্ট। আমরা আরাম করে বসে আছি ওদের পিঠে আর ওরা আমাদের বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সত্যিই আমরা প্রাণীদের উপর খুব অত্যাচার করি। ” আস্তে আস্তে নীচে নেমে আসলাম। নেমে পড়লাম ঘোড়ার পিঠ থেকে। যাওয়ার সময় লক্ষ্মীর গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করে দিলাম। লক্ষ্মী লেজ নেড়ে জানান দিল ও খুব খুশী। যেন বলতে চাইছে, আবার এসো। টা টা বাই বাই।

 গাড়িতে উঠে বসলাম। গাড়ি চলছে। পথে একটা হোটেলে লাঞ্চ খেয়ে আবার বেরিয়ে পড়লাম। জগৎ আঙ্কেল খুব ভালো। মজার মজার কথা বলে। জগৎ আঙ্কেলের বাড়িতে আমার বয়সী এক মেয়ে আছে। এবার চলেছি ভাইসরিগেল লজ। বিরাট প্রাসাদ। ব্রিটিশ আমলে তৈরি। টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকলাম। কী সুন্দর ফুলের বাগান। সাজানো-গোছানো। অনেক ছবি তুললাম। বাগানের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাবার কাছে এই প্ল্যালেসের গল্প শুনছিলাম। ইংরেজরা গরমকালে সিমলা থেকে দেশ চালনা করতো। সেইজন্য এই প্ল্যালেস তৈরি করা হয়। নাম ভাইসরিগেল লজ। এখন এখানে গবেষণা করা হয়। এক বড়ো টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। মা বলল, এই টেবিলে বসেই নাকি ভারত(India), পাকিস্তান(Pakistan) ভাগের ম্যাপ তৈরি হয়েছিল। মনটা কেমন করে উঠল। আমার মন খারাপ দেখে বাবা বাইরে এসে আইসক্রিম খাওয়ালো।  বাবা জানে আইসক্রিম খেলে আমার মন ভালো হয়ে যায়। আমি খুব খুশী হলাম।

এবার আমরা যাব ঝাকু টেম্পল, ওটা একটা হনুমান মন্দির। অনেক সিড়ি পেরিয়ে মন্দিরে যেতে হয়। ভগবান হনুমানের বিরাট উঁচু মূর্তি। মাথা তুলে দেখতে হয়। জগৎ আঙ্কেল আমাকে হনুমান ঠাকুরের কাছে নিয়ে গেল। প্রণাম করে ঠাকুরমশাইয়ের কাছ থেকে হাত পেতে প্রসাদ নিলাম। এই মন্দিরে অনেক হনুমান আছে। আমাদের এখানকার মতো হনুমান নয়। মুখ-হাত কালো নয়, লালচে। হনুমানগুলো মন্দিরের চাতালে, গাছের ডালে লাফালাফি করছে। আমাদের একদম কাছে চলে আসছে। আমি তো ভয়ে বাবাকে জড়িয়ে আছি। মাও  হনুমান দেখলে ভয় পায়। ছোট বেলায় মাকে একবার একটা হনুমান ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিল। পড়ে গিয়ে মার হাত ভেঙে গিয়েছিল। আমি ভাবছি, ঠাকুরমশাই আমাকে যে প্রসাদ দিয়েছেন তা যেন হনুমানে খেয়ে না নেয়। আর তখনই একটা হনুমান গাছ থেকে ঝুপ করে নেমে জগৎ আঙ্কেলের জুতোজোড়া নিয়ে পালাল মন্দিরের চাতালে। মা তাড়াতাড়ি আমার জুতো সরিয়ে ফেলল। মহা মুশকিল। কী করা যায়। বাবা তখন মন্দিরের পাশের এক দোকান থেকে এক প্যাকেট ছোলা কিনে প্যাকেটটি  হনুমানটি দেখিয়ে  ইসারা করতে লাগল। প্রথমে হনুমানটি পাত্তাই দিচ্ছিল না। জগৎ আঙ্কেল তো বারবার হাত জোড় করছে। কিছুক্ষণ পর জুতো ফেলে দিয়ে ছোলা নিতে হনুমান নীচে নেমে আসল। জগৎ আঙ্কেল সেই ফাঁকে মন্দিরের চাতালে উঠে জুতো উদ্ধার করল। অন্ধকার হয়ে এলো। সিমলা শহরের চারিদিকে আলো। মন্দির থেকে দারুণ লাগছিল। আস্তে আস্তে সিড়ি বেয়ে নীচে নেমে আসলাম। দূর থেকে হনুমান ঠাকুরকে ভক্তিভরে প্রণাম করে গাড়িতে উঠে বসলাম। গাড়ি চলল সিমলা বাজারে। একটা পাঞ্জাবী হোটেলে ডিনার খেয়ে চললাম হোটেলের দিকে। কাল সকালে  সিমলাকে বিদায় জানিয়ে যাব আর এক নতুন পাহাড়ী শহর — মানালি(Manali)। সেই গল্প অন্যদিন বলবো।

Srijani saha
সৃজনী একটা মিষ্টি ও প্রানউচ্ছল মেয়ে । ও করিমপুর সুধাস্মৃতি শিশু নিকেতন, নাদিয়া জেলার তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here