সাংতি তে শান্তির খোঁজে

0
60
থাকবেন দিরাংএ যাবেন সাংতিতে (Sangti)। কেমন অদ্ভুত লাগছে শুনতে? দিরাং সাংতিতে এসব? ঘাবড়ানোর দরকার নেই। স্রেফ ব্যাকপ্যাকটা গুছিয়ে ফেলুন। সব বলছি। কারণ যে গল্প শোনাবো তাতে তো ঘরেবসে থাকতে পারবেন না! বেরিয়ে পড়তেই হবে। দিরাং হচ্ছে অরুণাচল প্রদেশের (Arunachal Pradesh) একটা জায়গা। সেখান থেকে মাত্র ১০/১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সাংতি এক স্বর্গরাজ্য। অরুণাচলের এক কোণায় যার নিশ্চিন্ত বসবাস। সাধারণত ট্যুরিস্টরা এই সাংতিতে আসেন না। কারণ আচেনা জায়গা। নাম না জানা এক মায়াবী উপত্যকা। এ উপত্যকা যেন শিল্পীর ক্যানভাসে আঁকা ছবি। যেদিকে তাকাই দেখি পাহাড় আর দিগন্তজোড়া খেত সবুজ হাসি হাসছে। পাহাড়ি নদীর বাহার মুগ্ধ করবেই করবে। হোটেল রিসর্ট নেই তাই অকারণ চিৎকার চেঁচামেচিও নেই। নিস্তব্ধতা যে এত সুন্দর এত মন কেমন করায় এখানে না এলে বোধ হয় বুঝতেই পারতাম না। চাইলে আপনি আপেল এর বাগানেও ঘুরে বেড়াতে পারেন। সেখানে মৃদু মন্দ হাওয়ার সাথে আনেক নাম না জানা পাখির আওয়াজ সঙ্গ দেবে। কিউয়ি,এপ্রিকট এর বাগান ও আছে।
প্ল্যান ছিলোনা সাংতি (Sangti) যাওয়ার কারণ তার নামই যে জানিনা। বিখ্যাত লোকেশন তাওয়াং এ যাবো সেরকমই ভাবনা ছিলো। বদলে গেলো গুয়াহাটিতে পৌঁছে। হাওড়া থেকে কামরূপ এক্সপ্রেসে চড়ে গুয়াহাটি নামলাম। একটা গাড়ি বুক করেছিলাম গুয়াহাটি (Gauhati) থেকে তাওয়াং যাওয়ার জন্য। সেই গাড়ির ড্রাইভারই বললেন এই সাংতির কথা। বললেন সেখানে প্রকৃতি চুপটি করে হাসে। অগত্যা  চালাও গাড়ি সাংতি যাবো। সেখানে গাড়ি নিয়ে যেমন যাওয়া যায় তেমনই ট্রেক করেও যাওয়া যায়। দিরাং থেকে তাওয়াং যাওয়ার কথা। আবার দিরাং থেকে সাংতির  (Sangti) দূরত্ব মাত্র ১০/১২ কিমি। গুয়াহাটি থেকে গাড়িতে দিরাং পৌঁছে সিদ্ধান্ত নিলাম ট্রেক করে সাংতি যাবো।
পরের দিন সকাল ৬.৩০ টা নাগাদ আমি আর সেই ড্রাইভার নাম তাঁর চিনশু দুজনে মিলে ট্রেক করতে শুরু করলাম। বিকেল নাগাদ পৌঁছলাম সাংতিতে (Sangti)। সন্ধ্যে নামার তাড়া এখানে বড্ড বেশি। তাই সেদিন বিশেষ কিছু দেখা হলো না। চিনশু নিয়ে গেলো একজনের বাড়িতে। সেই রাতে সেখানেই থাকার ব্যবস্থা হলো। পরে জেনেছিলাম ওটা চিনশুর শ্বশুরবাড়ি। সেদিন ব্যাগ জিনিসপত্র রেখে বেরিয়ে পড়লাম এদিক ওদিক ঘুরলাম। আপেল বাগান আর নদীর ধারে সামান্য ঘুরে ফিরে এলাম সন্ধ্যে হতেই। সেদিন ক্লান্তও ছিলাম অতটা ট্রেক করে দিরাং থেকে এসেছিলাম। তবে সাংতির পরিবেশ ক্লান্তি অনেকটা মুছে দিয়েছিল। 

পরের দিন ঘুম ভাঙল বিচিত্র আওয়াজে। বিচিত্র আওয়াজ কারা করছিলো !! না মানুষ নয়। করছিলো পরিযায়ী পাখির দল। শীতকালে সবচেয়ে বেশি যারা এসে ভিড় জমায় তারা ব্ল্যাক নেকড ক্রেন। আরও নানান রং বাহারি পাখির দল ও দেখা দেবে। আমরা বেরিয়ে পড়লাম। চোখ জুড়িয়ে দিলো পাহাড়ের ঢালে চড়ে বেরানো ভেড়ার পাল। সারিবদ্ধ ভাবে তারা কি শৃঙ্খলা মেনে চলাফেরা করে দেখলে অবাক হতে হয়।

এখানে নদীর নামও সাংতি (Sangti)। অথবা বলা যায় নদীর নামেই উপত্যকার নাম। উপত্যকায় হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম  নদীর পাড়ে। নদীর পাড়ে বসে ভাবছিলাম এত সৌন্দর্যয় প্রকৃতি লুকিয়ে রেখেছে এই উপত্যকায় যে শুধুমাত্র এই উচ্ছল নদীর পাড়ে বসে নদীর রূপ দেখেই গোটা দিন কাটিয়ে দেওয়া যায়।  এখানে সারাদিন মেঘ আর রোদ্দুর লুকোচুরি খেলে। আপনার যদি আমার মতো মাছ ধরার শখ থাকে তাহলে সোনায় সোহাগা। এখানে অনেকের বাড়িতেই  ছিপ আছে। ইচ্ছা প্রকাশ করলে সে ছিপও জোগাড় হয়ে যাবে। 
এবার ঢুকে পড়লাম গ্রামের ভেতরে। এখানে মূলত “মংপা” (Mangpa) উপজাতির মানুষদের বসবাস। সারি সারি কাঠ ও পাথরের বাড়ি সব। অনেকেরই প্রধান জীবিকা ভুট্টা চাষ। প্রথমে ভুট্টা রোদে শুকনো হয়। তা থেকে দানা বের করে পেষাই করে রুটি তৈরি হয়। বাঁশের তরকারির সঙ্গে এই রুটি এবং মোমো এখানকার স্পেশাল ডিশ। তবে মাংসের নানান পদ এবং সয়াবিন এবং নানা রকম মশলা দিয়ে একটা ভীষণ ঝাল একটা পদ তৈরি করা হয় যা স্থানীয় ভাবে খুব জনপ্রিয়।  আপনি যদি মদ্যপ্রেমি হন তাহলেও রয়েছে সুখবর। তিন ধরনের মদ পাবেন যা একদম ঘরে তৈরি । “বংচ্যাং” এবং “আরা” এই দু প্রকার এর মদ তৈরি হয় ভাত থেকে। তার মধ্যে বংচ্যাং সবচেয়ে জনপ্রিয়। এছাড়া আছে ভুট্টা থেকে বানানো মদ।
গ্রামের অলিগলি ঘুরে পৌঁছলাম বমডিলা মোনাসট্রিতে। তার যে কি অপূর্ব কারুকাজ তা লিখে প্রকাশ করা যাবেনা। এরপর আমাদের যেতে হবে তাওয়ান। তাই মনে ইচ্ছে থাকলেও আর থাকা হোল না সাংতিতে (Sangti)। পরের দিনই সকালে চিনশু নিয়ে এলো একটা গাড়ি। তাতে সওয়ার হয়ে পৌঁছে গেলাম দারিং। এবার যেতে হবে তাওয়ান । 
অরুণাচল প্রদেশ ট্যুর করলে অবশ্যই লিস্টে রাখুন সাংতি কে ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here