অবিশ্বাস্য সৌন্দর্যের শহর পোখরা

0
96

নেপালের কথা মনে হলেই চোখের সামনে ভেসে  উঠে  শ্বেতশুভ্র  হিমালয় পর্বতমালার ছবি। আর এই পর্বতমালার অন্যতম আকর্ষণ অন্নপূর্ণা পর্বতশৃঙ্গ৷ প্রকৃতপক্ষে, অন্নপূর্ণা হলো একস্থানে সংহত পর্বত-স্তুপ৷এতে রয়েছে ২৬৫৪৫ ফিট একটি শৃঙ্গ যা কিনা অন্নপূর্ণা-১ নামে পরিচিত, ২৩০০০ ফিট ১৩টি এবং ২০০০০ ফিট উচ্চতার ১৬ টি শৃঙ্গ৷এই পর্বত স্তূপটি মোট ৫৫ কিলোমিটার বা ৩৪ মাইল দীর্ঘ৷ নেপালে বেড়াতে  গেলে আপনি অন্নপূর্ণা দেখার সুযোগ থেকে অবশ্যই নিজেকে বঞ্চিত করবেন না৷ অন্নপূর্ণা দেখতে চাইলে আপনাকে যেতে  হবে মধ্য নেপালের শহর পোখরাতে (Pokhara)। ভৌগলিক অবস্থানের কারণে পোখরা এখনও শহুরে যান্ত্রিকতা থেকে মুক্ত।প্রকৃতির সাথে কিছু সময়  একান্তে কাটানোর জন্য অনেকই  পোখরাতে আসেন। আবার, প্যারা গ্লাইডিং, বাঞ্জি জাম্পিং, পাহাড় ট্র্যাকিং এবং আলট্রা লাইট ফ্লাইটের মতো  রোমাঞ্চকর  অভিজ্ঞতা নিজের  ঝুলিতে যোগ করতে পৃথিবীর  বিভিন্ন  প্রান্ত  থেকে  অনেক পর্যটকেরা ছুটে  আসেন পোখরাতে।

পোখরা শহরটি  নেপালের রাজধানী কাঠমুন্ডু  থেকে  মাত্র ২০০ কিমি বা ১২০ মাইল  দূরে অবস্থিত। পৃথিবীর দীর্ঘতম পর্বতমালা হিমালয়ের পাদদেশে   পোখরা শহরের অবস্থান।এলেই বুঝবেন কি অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দিয়ে সাজানো সবকিছু। ১৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ হিমালয়ের সারি সারি পর্বতশৃঙ্গের বেশ একটি বড় অংশ দেখা যায় এই পোখরা থেকে।একারণে পোখরাকে, “মাউন্টেন ভিউ”– এর শহরও বলে।

অন্নপূর্ণা পর্বতটি  পোখরা থেকে  মাত্র ৩০-৩৫ কিমি দুরে অবস্থিত হওয়ার কারণে প্রায় সব ট্রেকারই সেখানে পৌঁছনোর জন্য এই শহর থেকেই  যাত্রা শুরু করেন। আপনার ভ্রমণে আপনি শুধু পাহাড় আরোহণ বা অন্নপূর্ণায় ভোরের সূর্যোদয়ের অপরূপ শোভা দেখবেন তাই নয়, পোখরায় আপনার জন্য রয়েছে ফেওয়া লেক, শরনকোট, ডেভিস ফলস্, ইত্যাদির মতো বিশেষ আকর্ষণগুলো

ফেওয়া লেক (Phewa Lake)- ফেওয়া লেক নেপালের ২য় বৃহত্তম লেক। ফেওয়া লেকটি পর্যটকদের কাছে খুব প্রিয়। এর কারণ হলো লেকটিকে ঘিরে পর্যটকদের আনন্দ  দেবার উদ্দেশ্যে ব্যবস্থা করা হয়েছে নৌকা চালানো ও ক্যানুইং করার সুযোগ। অনায়াসে  সাঁতারও  কাটতে  পারেন, আবার চাইলে মাছও ধরতে  পারেন। অন্যদিকে আরাম করে বসে নানা রং-বেরঙের পাখি দেখেও চমৎকার সময় পার করতে পারেন।
শরনকোট (Sarangkot)  
একটি অকল্পনীয় সুন্দর সূর্যোদয়ের মাধ্যমে  দিন শুরু করতে চাইলে শরনকোট নামের  জনপ্রিয়  টুরিস্ট স্পটে  চলে যেতে পারেন। শরনকোট থেকে  আপনি  অন্নপূর্ণা, ফেওয়া লেক ও পোখরা ভ্যালির অপরূপ ভিউ দেখতে পাবেন। এছাড়াও প্যারা গ্লাইডিং করার সুযোগ রয়েছে এই স্পটটিতে।
ডেভিস ফলস্ (Devi’s Falls)- এই বিস্ময়কর ঝর্ণাটি  প্রায় ১০০ ফিট গভীর।এই ঝর্ণাটি ভূগর্ভস্থ একটি টানেলে অদৃশ্য  হয়ে গেছে।  এই টানেলটির দৈর্ঘ্য  ৫০০ফিট৷ এই ঝর্ণাটি  পোখরা বিমানবন্দর থেকে মাত্র ২ কিমি দূরে অবস্থিত। যদিও এই ঝর্ণাটির নামকরণ নিয়ে এক করুণ কাহিনী জড়িয়ে আছে৷ ১৯৬১ সালের ৩১ জুলাই এক সুইস দম্পতি এই ঝর্ণায় স্নান করতে যান৷কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত: মহিলাটি ঝর্ণার জলে ডুবে যান। দীর্ঘ ৩ দিনের চেষ্টার পর তার মৃতদেহ পাওয়া যায় নিকটবর্তী এক নদীতে৷ঐ মহিলার বাবার ইচ্ছা অনুসারে ঝর্ণাটির নামকরণ করা হয় ‘ডেভিডস্ ফলস্’, যদিও পরবর্তীতে তা হয়ে যায় ডেভিস ফলস্ (Devi’s Falls) ৷
তিনটি ব্যতিক্রমধর্মী মিউজিয়াম বা জাদুঘর- পোখরাতে রয়েছে তিনটি জাদুঘর যা নেপালের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে তুলে ধরে।যদি  আপনি  মিউজিয়ামে ঘুরতে চান  তবে নীচেরগুলিতে যেতে পারেন। ইন্টারন্যাশনাল মাউন্টেন মিউজিয়াম  ( International Mountain Museum) পাহাড়-পর্বতের ইতিহাস জানতে আগ্রহী হলে ইন্টারন্যাশনাল মাউন্টেন মিউজিয়ামের কোনও বিকল্প নেই। এখানে বিভিন্ন ডকুমেন্টারির  মাধ্যমে দেখানো হয় পর্বতের ভৌগলিক অবস্থান, পাহাড়ে ওঠার নিয়ম, ইত্যাদি। ২০০৪ সালে এটি স্থাপিত হয়।এই মিউজিয়ামে এডমন্ড  হিলারি ও তেনজিং নোরগের ১৯৫৩ সালের এভারেস্ট জয়ের বৈপ্লবিক ঘটনা চমকপ্রদভাবে সংরক্ষণের জন্য  আলাদাভাবে একটি গ্যালারি তৈরি করা হয়েছে। রহস্যময় প্রাণী ইয়েতিকে নিয়েও নানা তথ্য রয়েছে।এছাড়া নেপালি উপজাতিদের ব্যবহৃত তৈজস পত্র, পোশাক ও অলংকার প্রদর্শিত হয়েছে। 
 
গুর্খা মেমোরিয়াল মিউজিয়াম (Gurkha Memorial Museum)- নেপালি  জাতীয় সৈনিকেরা গুর্খা হিসেবে পরিচিত।গুর্খা মেমোরিয়াল মিউজিয়াম তাদেরকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। এটিতে সৈনিকদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র ও ইউনিফর্ম সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। এছাড়া তাদের ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার শান্তি মিশনে অবদানের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
অন্নপূর্ণা প্রজাপতি জাদুঘর (Annapurna Butterfly Museum)- এই জাদুঘরটি পৃথ্বী নারায়ণ বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত। এখানে রয়েছে প্রায় ৬০০ প্রজাতির প্রজাপতি ও মথ। প্রজাতি অনুসারে প্রজাপতিগুলোকে সংরক্ষণ করা হয়েছে কাঠের ড্রয়ারে। নেপালের সবচেয়ে বড় প্রজাপতি কোর্মান বার্ডমিং এখানে দেখতে পাওয়া  যাবে।
শান্তির সন্ধানে নেপাল  মূলত: একটি  হিন্দু-প্রধান রাষ্ট্র। এ কারণেই  পোখরায় দেখা  যায় অসংখ্য মন্দির।আবার, নেপালেই রয়েছে লুম্বিনী গ্রাম যেখানে গৌতম বুদ্ধ জন্মগ্রহণ করেন। আর রয়েছে অনেক প্যাগোডা, স্তুপা ও মন্যাস্ট্রি। শান্তি প্যাগোডা ( Pokhara Shanti Stupa) পোখরা শান্তি স্তুপার আরেক  নাম শান্তি প্যাগোডা।এটি আন্দু পর্বতের উপর অবস্থিত।এখানে অনেকেই মেডিটেশন করতে আসেন। পাহাড়ের উঁচুতে নির্মিত এই স্থাপনাটি দেখতে খুব সুন্দর।
মহেন্দ্র গুহা (Mahendra Cave) ডেভিস ফলসের উলটো দিকেই দেখা যাবে মহেন্দ্র গুহা। এই গুহা চুনা পাথর দিয়ে তৈরি। এখানে প্রচুর বাদুড় দেখা যায়। এর কিছুটা দূরে চেমেরি গুহা অবস্থিত। কোন সময় যাবেন: সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর হল পোখরা সফরের উপযুক্ত সময়। এরপরে গেলে প্রচণ্ড শীতের কবলে পরবেন। আবার বর্ষায় গেলে যাতায়াতে অসুবিধা পোহাতে হবে।কীভাবে যাবেন: ২৫ মিনিটের মধ্যেই পোখরা পৌঁছে যাবেন যদি আপনি কাঠমুন্ডু  ত্রিভুবন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে উড়োজাহাজে যান। বুদ্ধ এয়ার ও ইয়েতি এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজসমুহ পোখরা আর কাঠমান্ডুর মাঝে চলাচল করে।অনেকে আবার বাসে বা নিজস্ব গাড়ীতে যেতে পছন্দ করতে পারেন। সেক্ষেত্রে ৫-৬ ঘণ্টা সময় লাগবে। পোখরা মূলত পর্যটনকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। পোখরার সৌন্দর্যের জন্য একে বলা হয় নেপালের রাণী। তাই আপনিও অবসরে ঘুরে আসতে পারেন পোখরা থেকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here