আপনার হয়ত ইকো ট্যুরিজিমের অভিজ্ঞতা আছে, কিন্তু কখনও কোনও পাহাড়ি গ্রামের ফার্ম হাউসে কি থেকেছেন? সেরকম কোনও অভিজ্ঞতা না থাকলে “পেত্রিচর” (Petrichor) ঘুরে আসতে পারেন। সবুজের সমারোহ আর মায়াময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেখানে হাত ধরাধরি করে বন্ধুর মত চলে। পাহাড় এখানে সমতলের সঙ্গে মেলে। পাহাড়ে দু’দিন থেকে দেখুন জৈব প্রক্রিয়ায় নানারকম শাক-সব্জির ফলন। আর আপনি বাগানপ্রেমী হলে তো কথাই নেই। হয়ত অবচেতনেই মাটির টানে শামিল হয়ে যাবেন। তাহলে আর দেরি না করে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে কালিম্পং জেলার গরুবাথানের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ুন আর পৌঁছে যান পেত্রিচরে। 

গরুবাথান থেকে লাভা যাওয়ার পথে চেল নদীর পূব পারে পেত্রিচর। পেত্রিচর শব্দর অর্থ অনেকদিন পর বৃষ্টি হওয়া মাটি থেকে উঠে আসা মন মাতাল করা গন্ধ। মাত্র ১৪০০ ফুট উচ্চতার পেত্রিচরে (Petrichor) সবুজের গালিচা, জঙ্গল ও পাহাড়ের দৃশ্য যেন ক্যানভাসে আঁকা ছবি। 

কীভাবে যাবেন

শিয়ালদহ থেকে দার্জিলিং (Darjeeling) মেল বা উত্তরবঙ্গ যাওয়ার যে কোনও ট্রেনে এনজেপি’তে নামুন। ওখানেই ভাড়া গাড়ি বুক করতে পারবেন। প্রি-পেড ট্যাক্সি শিলিগুড়ি ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে, এছাড়া শিলিগুড়ি (Shiliguri) বাস স্ট্যান্ড থেকে শেয়ার গাড়ি কিংবা বাসেও আসতে পারেন। দূরত্ব মাত্র ৬২মাইল। গাড়িতে সময় লাগে দু’ঘন্টার মতো। নামতে হবে ‘সোমবার’-এ। 
প্রতি সোমবারে হাট বসে ওই জায়গায়। তাই পরিচিতি সোমবার নামে। ওখান থেকে আপনাকে এক কিমি’র মতো পথ হঁটে যেতে হবে। কারণ কোনও গাড়িই সরাসরি পেত্রিচর পর্যন্ত যায় না।

কোথায় থাকবেন

নানারকম ব্যবস্থা। আসলে বেড়াতে গিয়ে থাকার বা রাত কাটানোর এমন বৈচিত্র সচরাচর দেখা যায় না।

1. সাধারন মানের কুটির

ঘরগুলি বেশ রুচিসম্মত। সাধারণ কুটির বলতে যা বোঝায় অনেকটা সেরকম। ইঁট, বাঁশ, মাটি, অ্যাসবেস্টস দিয়ে তৈরি। বড়বড় জানালা আর আরামদায়ক বিছানা। এককথায় কম খরচে থাকার ব্যবস্থা খুব একটা মন্দ নয়। দু’জনের থাকার ব্যবস্থায় একদিনের ভাড়া ২০০০ টাকা। অতিরিক্ত কেউ থাকতে গেলে জনপ্রতি ৮০০ টাকা দিতে হয়। সঙ্গে সবার জন্য ব্রেকফাস্ট ফ্রি।

2. Premium মানের কুটির

বিশালাকায় জানালা। ঘরে বুকসেল্ফ ভরা বই। গান বাজনা বা গিটার বাজাতে জানলে তো কথাই নেই। ঘরে আছে গিটার। ইচ্ছামত বাজান। আর একান্তই প্রকৃতির সঙ্গে থাকতে চাইলে জানালার বাইরে খোলা আকাশ, সবুজের সমারোহ আর দূরের পাহাড় দেখেই সময় কাটিয়ে দিতে পারেন। আবার ঘর ছেড়ে বাইরে বেরনোর জন্য মন কেমন করলে বেরিয়ে পড়ুন। শুধু বেরোবার আগে ঘরে আপনার জন্য রাখা টুপিটা পরে নিন। আপনার ঘরে আছে ছোট পার্শ্ব টেবিল আর ঝুলন্ত বৈদ্যুতিক লন্ঠন। এখানে কেবল টিভি, এসি, ওয়াইফাই পাবেন না। তবে বাড়ির লোক, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য মোবাইলের 3G নেট পরিষেবা আছে। ইউরোপিয়ান স্টাইলের বড় বাথরুমে প্রমাণ সাইজের জানালা। স্নানের যাবতীয় সরঞ্জাম যথা সাবান, শ্যাম্পু, তোয়ালে ও টয়লেট পেপার অন্যান্য জায়গার মতো এখানেও ব্যবস্থা আছে। আর ইচ্ছা করলে সুইমিং পুলেও যেতে পারেন। মন চাইলে জলে নেমে পড়ুন। তবে সাঁতার না জানলে সাবধান। সুইমিং পুল কিন্তু বেশ গভীর। এই ব্যবস্থায় দু’ জনের জন্য প্রতিদিনের ভাড়া ৩০০০ টাকা। অতিরিক্ত কাউকে ঘরে নিতে হলে মাথা পিছু ১০০০ টাকা। তবে ব্রেকফাস্ট ফ্রি।

3. স্টুডিও সাধনা

নেপালীদের শতবর্ষপ্রাচীন বাড়িতে থাকতে চাইলে তাও পাবেন। কাঠের দোতলা বাড়ি। বাড়ির নাম সাধনা। এখানে আর্ট, ক্র্যাফট ও যোগা স্টুডিও আছে। ব্রেকফাস্ট সহ প্রতিদিনের থাকার খরচ ১০০০টাকা। তবে এমন কোনও পর্যটক যদি আসেন যারা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত তাঁদের জন্য দুটি ঘর সবসময় খালি রাখা হয়। ঘর দুটির নাম আর্টিস্ট রুম ও যোগী রুম। 

4. হোম স্টে সাটভা

স্থানীয় নেপালী পরিবারে হোম স্টে’র অভিজ্ঞতা ও পরিচিত হতে পারেন তাদের সংস্কৃতির সঙ্গে। পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্নতা নিয়ে কোনও কথা হবে না। নিজের হাতে বাগান করার সুযোগ নিতে পারেন। জনপ্রতি খরচ ৮০০টাকা। ব্রেকফাস্ট অবশ্য পকেটের খরচে। তাঁবুঃ কার্পেট বেছানো মেঝে। দু’জনের থাকার ব্যবস্থা। মাথা পিছু খরচ ৮০০টাকা। এখানেও ব্রেকফাস্টের খরচ আলাদা।

কী খাবেন

এখানে রান্নাঘর মানে কমিউনিটি কিচেন। সকলের জন্যই ফার্মের থেকে আনা শাকসবজির নিরামিষ রান্নার ব্যবস্থা। যারা রান্নার কাজে যুক্ত তাদের রান্নার হাত চমৎকার। এছাড়া কাঠের আগুনে তৈরি পিৎজা ও ঘরে বানানো রুটিও পাবেন। পেত্রিচরের বাড়িতে কোনও আমিষ খাবার রান্না হয় না। তবে কোনও ভ্রমণার্থী আমিষে আগ্রহী হলে নেপালী পাচক ফার্ম হাউসে রান্না করে দেন। এছাড়া চা ও স্ন্যাক্স পাবেন। এখানে মিলেটের তৈরি পানীয় স্থানীয় বিয়ার বা ‘টোংবা’ বাঁশের পাত্রে স্ট্র দিয়ে পরিবেশন করা হয়। নেপাল, দার্জিলিং ও সিকিমে এটি একটি পরিচিত পানীয়।

কোথায় ঘুরবেন

আসলে পেত্রিচর (Petrichor) নিছকই কোনও ফার্ম নয়। এখানকার গ্রামীন মানুষের জগৎটাই যেন জৈব সারের কৃষি কাজের নানা ক্রিয়াকলাপের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছে। এখানে যে কোনও গ্রামীন অনুষ্ঠানে এখানকার মানূষ অতিথিদের সঙ্গে খুশী ভাগ করে নেন।প্রকৃতি এখানে সবসময়ই সবুজ হয়ে ধরা দেয়। এখানকার জৈব সারের সব্জির বাগান ঘুরে দেখলে খারাপ লাগবে না। বাগান ও গাছপালার শখ থাকলে এখান থেকে আরও অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পারেন। পায়ে হেঁটে এখানকার গ্রাম ও জঙ্গল ঘুরুন। মানুষজন খুব সরল ও অতিথি বৎসল। এছাড়া ছবি আঁকতে পারেন। বাগানের কিছু কাজ করতে ইচ্ছা করলে হাত লাগান। আর কিছুই ভাল না লাগলে স্রেফ ঘুমিয়ে কাটান।

আর কী করতে পারেন

ভাড়ায় মোটরবাইক নিয়ে ঘুরুন।ছবি আঁকবেন কিন্তু সরঞ্জাম নেই। সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে ইচ্ছাপূরণ হবে। সুইমিং পুল ও যোগা ডেকের সুবিধারিডিং রুম ও লাইব্রেরি ফার্মের তৈরি সস, আচার্‌, জ্যাম, মধু ইত্যাদি বাড়ির জন্য সংগ্রহ করতে পারেন।
এখানে ট্রেকের ব্যবস্থা আছে। চেল নদী, ফাগু চা বাগান যেতে পারেন হেঁটে বা ট্রেক করে। পাহাড়ের উপরে ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক ডালিম ফোর্টও দেখে নিন। চিন্তা করবেন না, দুপুরের খাবার সঙ্গে প্যাক করে দেওয়া হয়। 
 
এছাড়া কোনও অতিথি এখানে এসে ফার্মের কৃষিকাজ, গো পালন, টুকিটাকি মেরামতি ইত্যাদির সঙ্গে রান্নাঘরের কাজে স্বেচ্ছাসেবীদের হিসেবে যোগ দিতে চাইলে স্বাগত। এর জন্য ডাইনিং টেবলে খাবার ফ্রি। 
ইমেইল-এ যোগাযোগের জন্যঃ [email protected]

তাহলে আর চিন্তা কেন, ধীরে সুস্থে প্রস্তুতি নিতে শুরু করুন আর সময় সুযোগ মত বেরিয়ে পড়ুন। 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here