মাইলের পর মাইল চা বাগানের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলেছি। গতবছর এইসময়। তখন লকডাইন ছিল না, করোনা ছিল না। কয়েকদিনের জন্য নিশ্চিন্ত জীবন। মনে হয়েছিল, জীবনটা আমার বলেই তো মন খুলে এভাবে ঘুরে বেড়াতে পারছি। এই গরমে একটু হিমেল হাওয়া, একটু ভেসে বেড়ানো মেঘ। ভিনদেশ বা ভিন রাজ্য নয়, একেবারেই মিরিকের লাগোয়া ছোট্ট অচেনা, নাম না জানা তাবাকোশি গ্রামে দু’দিনের জন্য এসেছি। কাল সকালে মালবাজার হয়ে শিলিগুড়ি, তারপর রাতে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া। 

আসলে নামটা প্রথম শুনেছিলাম আমার পরিচিত দৈনিক পত্রিকার এক সাংবাদিক বন্ধুর কাছে। কলকাতার অফিস তাঁকে উত্তরবঙ্গ এডিশনের দায়িত্ব দিয়ে শিলিগুড়ি পাঠিয়েছিল। ওখানকার চা বাগানের মালিক খবরের কাগজের লোকদের ওই গ্রামে নিয়ে গিয়েছিলেন চা বাগান শ্রমিকদের জন্য কী করেছেন দেখাতে। বন্ধুটি সেসব গল্পই বলছিল। তাঁর গল্পে যে আমি তাবাকোশির প্রেমে পড়ে যাব সে-ও ভাবতে পারেনি। 

আমার আগহ দেখে বলল- তুমি যাবে নাকি? আমি বললাম, দেখো, জলপাইগুড়ির মালবাজারে আমি যে কাজে এসেছি তার জন্য আমায় তিনদিন অপেক্ষা করতেই হবে। এখানে বসে থাকার চেয়ে অন্ততঃ দুটো দিন বরং কোথাও ঘুরে আসলে মন্দ হয় না। আমার বন্ধুটি বলল- ঠিক আছে, তাহলে কালই তুমি শিলিগুড়ির তেনজিঙ নোরগে বাস স্ট্যান্ড থেকে শেয়ারে একটা গাড়ি ধরে মিরিক পর্যন্ত আগে চলে যাও। ওখান থেকে বাকি ব্যাবস্থা আমাদের ফটোগ্রাফার বিকাশ করে দেবে।

বিপুলা এই পৃথিবীর কতটুকু জানি! পৃথিবী ছেড়ে দিন। এই বাংলার কতটুকু জানি! আবার সেই রবি ঠাকুর -‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া’। 

কলকাতা থেকে নিউজলপাইগুড়ি(এনজেপি) অনেকভাবেই আসা যায়। রাত ১০-০৫ মিনিটে দার্জিলিং মেল শিয়ালদহ থেকে ছেড়ে পরদিন সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে পৌঁছয়। শিয়ালদহ থেকে পদাতিক এক্সপ্রেস রাত ১১টায় ছেড়ে পরদিন সকাল দশটার মধ্যে পৌঁছয়। এছাড়া কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস ছাড়ে রাত ৭-৩৫ মিনিটে। উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস, তিস্তা তোর্সা ইত্যাদি। এরপর কীভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন, আচ্ছা বিমানে ও বাসেও তো এনজেপি আসা যায়, ভাড়া কীরকম হবে সেসবও আপনারা বুঝে নিন। 

সোজা এনজেপি থেকে গাড়ি নেবেন না শেয়ারে যাবেন নিজেরাই ঠিক করে নিন। আসলে এসব ফিরিস্তি না বাড়ানোই ভাল। সোজা কথা জেনে রাখুন, মিরিক থেকে মাত্র আট কিলোমিটার। সুতরাং মিরিক পর্যন্ত যাবার পর বাকি পথটুকুর জন্য আপনি কী করবেন, সে মাথাব্যাথা একান্তভাবেই আপনার।

কী আছে? কী নেই? আগে নেইয়ের দু’একটা কথা বলে নেওয়া যাক। শপিং মল নেই। ঝাঁ চকচকে রেস্তোরা নেই। সেজেগুজে দাঁড়িয়ে থাকলে দেখার লোকও নেই। ছোট্ট একটা গ্রামের ছবি যেমন হওয়ার কথা, তেমনিই। প্রকৃতির মাঝে দুটো দিন হারিয়ে যাওয়া। আমাদের রাজ্যে ‘টি ট্যুরিজিম’ সেভাবে গড়ে ওঠেনি। 

চাইলে জঙ্গলে থাকতে পারেন। পাহাড়ে থাকতে পারেন। কিন্তু চা বাগান মানে গাড়ি থামিয়ে দু’একটা সেলফি তোলা। ব্যাস, এখানেই শেষ। বাগানের মাঝে সরু রাস্তা দিয়ে মাইলের পর মেইল হেঁটে যাওয়া, হাত ধরে হারিয়ে যাওয়ার সুযোগ কোথায়? একসঙ্গে যদি একটু পাহাড়, একটু ঠান্ডা, একটু নদী, একটু মেঘ আর মাইলের পর মাইল চা বাগান পাওয়া যায়, মন্দ কী? 

তাহলে চলে যান তাবাকোশি। সবজান্তা গুগলে গিয়ে ছবি দেখে নিতেই পারেন। হোম স্টে-র বিছানা কেমন, বাথরুম কেমন, এসব নিয়ে না ভাবলেও চলবে। বিছানা, বাথরুম অনেক জায়গায় ঝাঁ চকচকে পাবেন। কিন্তু চাইলেই প্রকৃতির এমন নিবিড় সান্নিধ্য আর কোথায় পাবেন? দেরি না করে এই শীতের আগেই একবার ঢুঁ মেরে আসুন। কোথায় থাকবেন? কত ভাড়া? তার বিজ্ঞাপন আমি নাই বা দিলাম। গুগল বাবুকে জিজ্ঞেস করুন। সন্ধান পেয়ে যাবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here