বিদেশ ভ্রমণ মানেই শিহরন জাগানো আনন্দ। তাও আবার ডেসটিনেশন থাইল্যাণ্ডের (Thailand) ফুকেত (Phuket)। হানিমুনের জন্য সদ্য বিবাহিতদের প্রথম পছন্দের জায়গা। পাহাড়ে ঘেরা দ্বীপ সমষ্টির রাজ্য ফুকেত (Phuket)। যদিও দ্বীপের রাজ্য বললে ভুল হবে। সমুদ্র থেকে পাহাড় উঠে এসে দ্বীপগুলিকে ঘিরে রেখেছে। তাই এই জায়গার চোখ জোড়ানো নৈসর্গিক সৌন্দর্য আমার বহুদিনের সুপ্ত বাসনা পুরণ করেছে। আমাদের যাত্রার সেই দিনটা ছিল ১২ আগস্ট ২০১৯। আমার ও আমার স্বামীর কর্মস্থল দিল্লিতে। স্বামীর অফিস থেকে প্রতি বছর বিদেশ ঘোরার সুযোগ আছে। তবে বিদেশের অন্য কোনও জায়গায় থেকে ফুকেত (Phuket) যাওয়া সত্যিই স্পেশাল।

ফুকেত (Phuket) থাইল্যান্ডের একটি পৃথক রাজ্য। দিল্লি থেকে এখন সরাসরি ফুকেত যাওয়ার বিমান পরিষেবা চালু হয়েছে। এতে পর্যটকদের সময় ও পকেটের চাপ দুই কমে। একটু কম খরচে ফুকেত যাওয়ার বিমানগুলি দিল্লি থেকে মধ্য রাতে ছাড়ে। এছাড়া আছে থাই বিমান। দিল্লি (Delhi) থেকে মোটামুটি পাঁচ ঘন্টার কম সময়ে ফুকেত পৌঁছনো যায়। তবে কলকাতা থেকেও ফুকেত কিংবা থাই বিমান পরিষেবা রয়েছে।

আমরা ইন্ডিগোর বিমানে গিয়ে পরদিন ভোরে নামলাম ফুকেত (Phuket) বিমানবন্দরে। দক্ষিণ পূর্ব থাইল্যান্ডের এই রাজ্যে ভিসা অন অ্যারাইভাল। ঘন্টা খানেকের মধ্যে ভিসা সংক্রান্ত কাজ মিটলো। ততক্ষণে আমাদের ট্যুর কোম্পানির গাড়ি বিমানবন্দরে এসে হাজির। দলে ছিলাম তিরিশ জন। আলাদা আলাদা গাড়িতে আমরা হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। আমাদের থাভর্ন বিচ রিসর্ট হোটেল গাড়িতে মেরে কেটে ৪৫ মিনিট। খুব খিদে পেয়েছিল। প্রাতঃরাশ সেরে রিসর্টের বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই এগার ঘন্টার ক্লান্তি যেন এগার মিনিটেই উধাও। এই প্রথম কোনও দ্বীপ সমষ্টির রাজ্যে পা রেখেছি। আগেই বলেছি, ফুকেত পাহাড় দিয়ে ঘেরা।

আশপাশের দ্বীপগুলিও তাই। এত বড় একটা দ্বীপ! অথচ বোঝার উপায় নেই। সমুদ্র যে ফুকেত শহরকে ঘিরে রয়েছে এটা বুঝতেই কয়েক ঘন্টা কেটে গেল। ফুকেত (Phuket) একটা উন্নত ও চমৎকার শহর। তবে, খরচ যেন একটু বেশি। বিমান ভাড়া নিয়ে মাথা পিছু ৫০,০০০ টাকা। এখানেই শেষ নয়। থাইল্যান্ডের দূতাবাসের নিয়মানুযায়ী যে কোনও পর্যটককে সঙ্গে করে আরও তিনশো ডলার সঙ্গে রাখতেই হবে। এটা বাধ্যতামূলক।

আমরা ভ্রমণ সংস্থার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ায় তাদের কথামতই আমাদের ঘোরার নির্ঘন্ট তৈরি হয়েছিল।
সেইমত, প্রথমদিন আমরা ইচ্ছামত পায়ে হেঁটে ফুকেত (Phuket) শহর ঘুরলাম। তবে ছোট ছোট অটো শহরের বুক চিরে দিন-রাত ছুটে চলেছে। থাই কারেন্সি দিয়ে দশ মিনিটে হোটেল থেকে ফুকেতের সেন্টার পয়েণ্টের পাটাং বিচে চলে যাওয়া যায়। ফুকেতের প্রধান বৈশিষ্ট নাইট লাইভ। তার সঙ্গে আছে সি ফুড, আর হরেকরকম কেনাকাটার পসার। পাটাং ফুকেতের প্রাণ কেন্দ্র। আছে বাংলা স্ট্রিট। যার পুরোটাই জুড়ে ছড়ানো বৈভবের নানা উপকরণ। তবে নামে বাংলা হলেও এই জায়গার সঙ্গে বাংলার কোনও সম্পর্ক নেই। রাত আটটা থেকে ভোর রাত পর্যন্ত বার, নাইট ক্লাব খোলা থাকে। দেশ বিদেশের পর্যটকরা এই বাংলা স্ট্রিট-এ ভীড় জমান।

আর ফুকতের (Phuket) পর্যটন শিল্প এই বাংলা স্ট্রিটকে ঘিরেই টিকে রয়েছে। প্রতি দিন কোটি টাকার ব্যাবসা হয়। রাস্তার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঝলমলে জায়ান্ট স্কিনে সারাক্ষণ বড়বড় পানশালা ও রেস্তোরার ছবি ফুটে উঠছে। ফুটে উঠছে থাই ও বিদেশী নারীদের ইংরেজি গানের তালে নৃত্যে উদ্দাম হয়ে রাত্রিযাপন। পাশাপাশি যৌনপল্লীর রমরমা ব্যবসা অনুমতিপত্র নিয়েই চলছে। এভাবেই ফুকেতবাসী দিনের পর দিন পর্যটকদের আনন্দে মাতিয়ে রেখেছে। এছাড়াও রয়েছে একাধিক শপিং মল। আছে অজস্র স্পা। 

তবে স্পা’তে মানুষ নয়, মাছেরা ম্যাসাজ করে মানুষের মন মাতাচ্ছে। আর খাবার? রকমারি সি ফুড থেকে রোস্টেড কুমিরের মাংস সবই পাবেন। ফুকেতের ব্যবসা সর্বত্র চালাচ্ছেন থাই মহিলারা। কারণ, মহিলারা বেশি পরিশ্রমী। ফুকেতের সমুদ্র সৈকতের ভিউ মন থেকে মোছার নয়। ভিউপয়েন্ট, বুদ্ধ মন্দিরের অন্দরের কারুকার্য এতটাই অসাধারণ যে আপনি ক্যামেরা বন্দী না করে থাকতে পারবেন না। ওয়াংথালামের দুনিয়া জোড়া খ্যাতি সমুদ্র থেকে মুক্ত ও রকমারি পাথর ও অমূল্যরতন ভান্ডারের জন্য।

১৪ তারিখ সকালে প্রাতঃরাশ সেরে “ফি ফি” দ্বীপের (Phi Phi Island) উদ্দেশ্যে যাত্রা। যেখানে সুপার হিট হিন্দি সিনেমার গান “কহনা পেয়ার হ্যায়” শুটিং হয়েছিল। এই দ্বীপে সফর করতে হয় তিন তলা ক্রুজ জাহাজ সারা দিনে একবার যাতায়াত করে। সময় লাগে সাত ঘণ্টা। জাহাজে তিন ঘণ্টা উত্তাল সমুদ্র পেরিয়ে ফি ফি দ্বীপে আপনি পৌঁছে যেতে পারেন। মধ্যাহ্ন ভোজ সেরে কাচের মত সমুদ্রের জলে স্নান সত্যিই উপভোগ্য। নানা জাতের মাছের সঙ্গে খেলা করুন, চাইলে নিজের হাতে মাছও ধরতে পারেন। কয়েকশো পর্যটকের ভীড়, কিন্তু কোনও ঝক্কি নেই। ঝকঝকে বিচ কোমরিং থেকে ফোটো সেশন। কিংবা ওয়াটার স্পোর্টসে স্কুবা ড্রাইভিং করে সমুদ্রের গভীরে অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস আর ওয়াটার বাইকের হাতছানি। 

তবে এসবের মজা নিতে হলে আপনাকে পকেট থেকে বাড়তি কড়ি গুনতে হবে। ফিফি থেকে ‘মায়াবে’ সৈকতে ঘুরতে নিয়ে যাওয়া হয়। খুব ছোট্ট একটি প্রাকৃতিক দ্বীপ। বাস্তবিকই মায়াময় দ্বীপ। এই দ্বীপ ভ্রমণ কিন্তু ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে। ফি ফি থেকে ছোট ছোট খেয়া নৌকোয় যেতে হয়। সমুদ্রের ঢেউয়ে এই মায়াবী তৈরি হয় ও হারিয়ে যায়। তাই এই দ্বীপ মায়াবি বলে পরিচিত।

শেষদিনে জেমস বন্ড দ্বীপ (James Bond Island)। বন্ডের সিনেমার শুটিং স্পট হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল। যা থেকে জেমস বন্ডের দ্বীপ হিসেবে পরিচিত। যেতে হয় ক্রুজ জাহাজে। আর এই দ্বীপ দর্শনের মধ্য দিয়েই আমাদের ফুকেত সফর শেষ হয়। এরপর তাড়াতাড়ি রাতের খাওয়া সেরে বিশ্রাম নিন। না হলে, মধ্যরাতে উঠে বিমান ধরাটা ঝুঁকি হয়ে যাবে। তাই চাপ নেবেন না।

জীবনের ব্যস্ততা কাটিয়ে মধুচন্দ্রিমার উষ্ণ মুহূর্ত উপভোগ করতে ফুকেত (Phuket) এক অপরূপ গন্তব্য হতে পারে। কিছুটা ব্যয় সাপেক্ষ হলেও পাহাড় ও সমুদ্রে ঘেরা দ্বীপ সমষ্টির ফুকেত (Phuket) চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here