জানিনা অজস্রবার কেরালায়(Kerala) গিয়েও কেন এই মুন্নার(Munnar) জায়গাটার সন্ধান আমি অনেক পরে পেয়েছিলাম! আপনি যদি কোনও দিন মুন্নার(Munnar)-এ যান, তাহলে আপানার সঙ্গে আমার সব কিছুতে মতবিরোধ থাকলেও অন্ততঃ মুন্নার(Munnar) ঘোরার পর আপনি একমত হবেন যে, এমন সুন্দর জায়গা সত্যিই লাখে একটা পাওয়া যায়। পাগল করা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এমনিতেই কেরালাকে(Kerala) বলা হয় ‘ঈশ্বরের নিজের দেশ’। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে শেষ হয় না। মুন্নার-এর ঠান্ডা বা শীতল হাওয়া যেন এক খুশির হাওয়া। যা একটা আশ্চর্য রকমের সুখানুভুতি। এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে যেতে গিয়ে বারবার মনে হয়, এই বাতাস এক স্বর্গীয় দোলা দিয়ে যাচ্ছে। কেনই বা মনে হবে না, বিধাতা যে নিজের হাতে মুন্নারকে এভাবেই সাজিয়ে রেখেছেন।

কীভাবে যাবেনঃ হাওড়া(Howrah) থেকে আসুন কোচি(Kochi) জংশনে। দূরত্ব ২৩০০ কিমি। আগে যার নাম ছিল এর্নাকুলাম(Ernakulam)। হাওড়া থেকে অসংখ্য ট্রেন। এক্ষেত্রে, আপনি সেই ট্রেনই বাছবেন, যে ট্রেন অন্ততঃ বিকাল ৪টের মধ্যে (লেট করে হলেও) কোচি জংশনে পৌঁছয়। কারণটা পরে বলছি। আগে কোন ট্রেনে যাবেন ঠিক করে নিন। আমার পছন্দ ২২৮৭৭ আপ অন্তোদয় এক্সপ্রেস। বিকাল ৫টায় ছেড়ে ১ দিন ১৩ ঘন্টা পরে অর্থাৎ ৩৫ ঘন্টা পরে সকাল ৬ টায় কোচি জংশনে পৌঁছয়। সময় অনেকটাই লাগে। আবার, হাওড়া থেকে খুব কম সময়ে যাবার ট্রেনও আছে। ০০৬৪১আপ কে ওয়াই ও টিভিসি প্রিমিয়াম দুপুর ১২-৪০ মিনিটে ছেড়ে আপনাকে কোচি  স্টেশনে রাত ১টা ১৫ মিনিটে অর্থাৎ মাত্র ১২ ঘন্টা ৩৫ মিনিটে পৌঁছে দেবে। অত রাতে পৌঁছয় বলেই খুউব কম সময় লাগা স্বত্বেও অনেকেই এই সুপার ফাস্ট ট্রেনকে এড়িয়ে যান। তবে আগাম রিটায়ারিং রুম বুক করা থাকলে, এই ট্রেনের সত্যি কোনও বিকল্প নেই।
কোচি থেকে মুন্নার-এর দূরত্ব ১৩৫ কিমি। এর মধ্যে ৮০-৮৫ কিমি ভয়ঙ্কর পাহাড়ি পথ পেরিয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫২০০ফুট ওপরে মুন্নার। সব মিলিয়ে বাস বা প্রাইভেট গাড়ি, যাতেই আপনি যান, প্রায় ৫ ঘন্টার মতো সময় লাগে। কোচি জংশনের পাশেই বাস স্ট্যান্ড। কিন্তু, মনে রাখবেন মুন্নার-এর শেষ গাড়ি ৫ টার মধ্যেই ছেড়ে যায়। তাই শেষ গাড়ি ছেড়ে গেলে আপনাকে একটা দিন হোটেলে কাটাতে হবে। কোচিতে বেশ ভাল ভাল হোটেল আছে। কিন্তু একদিন অযথা হোটেলে না থেকে কোচিতে(kochi) পৌঁছনর দিনেই মুন্নার রওনা হয়ে যাওয়া ভাল।
Beautiful Munnar
কোচি(kochi) জংশন থেকে একটা অটো নিয়ে ১ কিমি দূরের KSRTC বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছে যান। ওখান থেকে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার বাস ছাড়ে। তাই বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে জেনে নিন মুন্নার(Munnar)-এ কোন বাস যাবে এবং কখন ছাড়বে। ভোর ৪টে থেকে এক ঘন্টা অন্তর বাস সার্ভিস। বাসগুলো দেখতে আহামরি না হলেও সিটগুলো বেশ ভালো এবং যথেষ্ট স্পেস আছে। এছাড়া সকাল ৯ টায় পাবেন এসি বাস। তবে এসি বাসে মুন্নারে গেলে ঠান্ডা বাতাসের অনুভূতি হারাবেন। পাহাড়ের খাদের পাস দিয়ে বাস ভ্রমণের ভয়ংকর অথচ সুন্দর অভিজ্ঞতা স্মৃতিতে গেঁথে রাখতে হলে মুন্নার যাওয়ার জন্য কেরালা(Kerala) সরকারের সাধারণ বাসের সত্যি কোনও তুলনা নেই। একজন প্যাসেঞ্জার হলেও, ঠিক সময়ে বাস ছাড়ে। মাঝ পথে বাস থামিয়ে প্যাসেঞ্জার তোলে না। স্বভাবতই ভ্রমণে আনন্দ পাওয়া যায়। বাস ঘন্টা দেড়েক ধরে কোচি শহর দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু স্টপেজ ছুঁয়ে  যাওয়ার সময় প্যাসেঞ্জার থাকলে তুলে নেয়। এর জন্য অবশ্য ৩-৪ মিনিটের বেশি দাঁড়ায় না। তবে প্যাসেঞ্জার না পেলে বাস দাঁড়ায় না। 
মুন্নার যাওয়ার সময় কোচি শহরটাকে এক ঝলক দেখে নেওয়ার সুযোগ হারাবেন না। ঝকঝকে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাস্তা। মনে হবে যেন এই মাত্র বৃষ্টি এসে ধুয়ে দিয়ে গেছে। বাস ক্রমশঃ এভাবেই আঁকাবাঁকা ঢেউ খেলানো পাহাড়ি পথের দিকে এগিয়ে যায়। পাহাড়ের পথ শুরু হতেই অসংখ্য ছোট, বড় হোটেল ও রেস্টুরেন্ট। যতই পাহাড়ের পাশ দিয়ে ভেতরের দিকে এগোবেন, নজরে পড়বে সুন্দর সুন্দর সব বাড়ি। দুর্দান্ত সব ডিজাইন। যা দেখে আপনার মনে হতে পারে, আমার যদি এমন একটা বাড়ি হতো, আমিও যদি এরকম বাড়িতে থাকতে পারতাম! বাস তিন ঘন্টা চলার পর আদিমালি নামে একটা পাহাড়ি বাস স্ট্যান্ডে থামবে। আপনি ওখানে নেমে ওয়াশরুমে যেতে পারেন। আছে ‘পে অ্যান্ড ইয়ুজ’ ব্যাবস্থা। এছাড়া, চা বা ঠান্ডা পানীয় কিংবা কিছু খাবার দাবার বা স্ন্যাক্সও কেনা যেতে পারে।। আদিমালিতে বাস ১২ মিনিটের মতো থামে। এরপর মুন্নার শহরে পৌঁছতে মাত্র ঘন্টা খানেক লাগে। পাহাড়ি পথের যাত্রায় ভাললাগা আছে। আবার এত বাঁক যে হাড় হিম করা ভয়ও আছে। গাঁয়ে কাঁটা দেয়, অনেকেরই হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যায়। মুন্নার যত এগিয়ে আসে ততই সবার মধ্যে ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়। অনেকেই সিট ছেড়ে কন্ডাক্টরের কাছে এগিয়ে গিয়ে কোথায় নামলে সুবিধা হবে জেনে নেন। কেউ আবার  যে হোটেলে বুকিং করেছেন তার নাম বলেন। তবে, মুন্নার আসার আগে আগাম হোটেল বুকিং করে আসলে ভাল হয়। মুন্নার-এ কখনও এসি হোটেল নেবেন না। কারণ ওখানে  তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি কখনও হয় না। এর ফলে সারাদিনই শীতল ও মনোরম হাওয়া বইতে থাকে। শুধু এই আবহাওয়ার জন্যই এখানে অনেকেই একবার আসার পর বারবার আসতে চান। এভাবেই মুন্নার পৌঁছতে লাগে ৪ ঘন্টা ২০ মিনিট। দূরত্ব অনুযায়ী অনেক বেশি সময় লাগে কারণ, পাহাড়ী পথে ঝুঁকির কথাটাও ভাবতে হয়।
Serene
কোথায় থাকবেন ও কী খাবেনঃ হোটেল বুকিং করা না থাকলে নো টেনশন। হোটেলের অভাব নেই। ডাবল বেডের রুমের ভাড়া ১০০০ টাকা থেকে শুরু। আমরা অবশ্য ১৪০০টাকার হোটেলে ছিলাম, সঙ্গে বুফে ব্রেকফাস্ট ফ্রি। এছাড়া সাউথ ইন্ডিয়ান রান্নার নানারকম পদ আছে। পাবেন থালি লাঞ্চ। এছাড়াও নিজের পছন্দের পদও পাবেন। কন্টিনেন্টালও পাবেন। পছন্দ না হলে আছে নর্থ ইন্ডিয়ান খাবারের এলাহী ব্যবস্থা।  
ইড্ডুকি(Idukki) জেলার মুন্নারে প্রায় ৪৫,০০০ হাজার লোকের বাস আর চা বাগান এখানকার সেরা সম্পদ। যা নিয়ন্ত্রণ করে টাটা কোম্পানি। দার্জিলিঙের(Darjeeling) মতই এখানকার চা পৃথিবী বিখ্যাত। মুন্নারের চা বাগানকে যেন প্রকৃতি নিজের হাতে সাজিয়েছেন  যা তুলনাহীন। চা বাগান তো আছে, কিন্ত মুন্নারের আর কোথায় যাবেন? মুন্নারে যে ৮টি জায়গা আপনাকে দেখতেই হবে।
(১) আটুক্কাড(Attukad) জলপ্রপাতঃ  মুন্নারের(Munnar) সেরা আট দর্শনীয় স্থানের অন্যতম। মুন্নার হিল স্টেশনের পশ্চিম ঘাটে এই জলপ্রপাত। প্রাণ জুড়ানো শীতল জলধারা। সারা বছর এখানে টুরিস্টদের আনাগোনা লেগেই থাকে। আর ট্রেকিংপ্রেমীদের জন্য তো আদর্শ জায়গা।
(২) মুনিয়ারা ডলমেনসঃ (Muniyari dolmens) মুনিয়ারা ডলমেনস মারায়ুর গ্রামে। ট্যাক্সি বা গাড়ি বুক করে আসতে হয়। প্রস্তরযুগীয় পাথরের টেবিল। এরই সঙ্গে দেখে নিতে পারেন প্রস্তরযুগীয় কবরের চেম্বারও। এই প্রত্নতাত্বিক গুরুত্বর কারনেই দুনিয়ার পর্যটকদের কাছে এই জায়গাটার আকর্ষণ।
(৩) ইকো(Echo point) পয়েন্টঃ  পাহাড়ের পাশে ছবির মতো দুর্দান্ত একটা লেক। কমবয়সীদের বড় পছন্দের। খুব ভাল পিকনিক স্পটও। অনেকেই আসেন ছবি তুলতে আর ক্যাম্পিং করতে।
(৪) এরাভিকুলাম(রাজা মালাই)ন্যাশানাল পার্কঃ (Rajamalai national park)সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২০০০ মিটারেরও বেশি উচ্চতায় এই পার্ক,  বিরল প্রজাতির গাছপালা এবং জন্তু জানোয়ারের দেখা পেতে চাইলে আপনাকে এই পার্কে আসতেই হবে। সাপ থেকে শুরু করে এমন কিছু জন্তু জানোয়ার আছে যা আপনি হয়ত এর আগে অন্য কোথাও দেখেন নি। বাঘ, লেপার্ড, নীলগিরি থার বা ছাগল, বুনো গরু বা মহিষ, সোনালী শৃগাল, জংলী বিড়াল কিংবা বুনো কুকুরদের দেখা পাবেন এখানেই।
(৫) মাট্টুপেট্টি(Mattupatty) বাঁধঃ হাইড্রোইলেক্ট্রিসিটি বা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পর সাহায্যে লেকের উপর তৈরি হয়েছে এই বাঁধ। বছরের পর বছর জলাধার থেকে জলের যোগানে আকৃষ্ট হয়ে হাজির হয় হরেক রকমের দেশী বিদেশী পাখি আর জীবজন্তু। জলে তারা আপন মনে খেলা করে। আর নিজেদের খেয়াল=খুশিমত এলোপাথাড়ি স্নাত হয়।
(৬) চিথিরাপুরমঃ(Chithirapuram) গালিচার মতো সবুজ চা বাগান। এছাড়া, মুন্নার থেকে মাত্র ১০কিমি দূরে পাবেন পুরনো আমলের বাংলো, কটেজ ও খেলার মাঠ। যাঁরা পুরনোর পুজারী, তাঁরা এই জায়গাটার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে নিজেরাই নস্টালজিক হয়ে পড়েন।
(৭) টপ(Top station) স্টেশনঃ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৮০০ মিটার উচ্চতায় এই টপ স্টেশন। শুধুই মেঘেদের রাজত্ব। বলতে পারেন মেঘ এখানে গাভীর মতো চরে। আপনি এখানে এসে প্রাণ খুলে শ্বাস নিন। আর অনায়াসে মেঘের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে ভেসে বেড়ান।
(৮) মারায়ুরঃ (Marayur)হিন্দু মহাকাব্যে আছে, পাণ্ডবরা তাঁদের নির্বাসনকালে এই স্থান ভ্রমণ করেছিলেন। মারায়ুর–এর পাহাড়ের গায়ে প্রস্তরযুগে খোদাই করা নানা পেন্টিং। দেখতে পাবেন পাথরের টেবিল। কেরালায় একমাত্র এখানেই আছে চন্দন বন ও ওষুধ তৈরি হয় এমন গাছগাছড়ার বন। এছাড়া মারায়ুর ভেষজের জন্যও বিখ্যাত।
মুন্নার(munnar) কেরালার অন্যতম প্রধান পাহাড়ী জায়গা। এক কথায় মুন্নারকে প্রকৃতি সবকিছু উজাড় করে দিয়েছে।  অসংখ্য পাহাড়, নদী, চা বাগান, ন্যাশানাল পার্ক, লেক ইত্যদির সমাহারে মুন্নার বাস্তবিকই স্বর্গ। শুধু একটা জায়গায় এত কিছু! একসঙ্গে এই অপরূপ সৃষ্টি, ভারতের অন্য কোথাও আছে কি না জানা নেই। এজন্যই  মুন্নার ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে এতটাই পছন্দের। বছরের যে কোনও সময় যাওয়া যায়। তাই মন স্থির করুন, আর ঈশ্বরের দেশের  উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ুন। 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here