ব্ল্যাক ফরেস্টের উপকণ্ঠে

0
89

গেংগেনবাখ জার্মানির বিখ্যাত ব্ল্যাক ফরেস্টের (Black forest) পশ্চিম উপকণ্ঠে অবস্থিত এক ছোট্ট শহর। তুলনামূলকভাবে অখ্যাত সেই শহরে প্রায় বছর দুয়েক আগে একবার ঘুরতে গিয়েছিলাম একদিনের ছোট্ট সফরে। জার্মানিতে (Germany) আমরা ছিলাম স্টুটগার্টের কাছে বোয়েবলিঙেনে, সেখান থেকে বার-দুয়েক ট্রেন বদল করে ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যায় গেংগেনবাখ। প্রথমে বোয়েবলিঙেন থেকে স্টুটগার্টের সেন্ট্রাল স্টেশন, সেখান থেকে ট্রেন বদল করে ফ্রেউনডেনস্টাড আর শেষ বদলিতে ফ্রেউনডেনস্টাড থেকে যে ট্রেনটা ধরলাম, সেটার হলদে রং আর তিনকামরার চেহারা দেখেই আমরা মুগ্ধ। ছোটখাটো দেখতে হলে কি হবে, সে মোটেও টয়ট্রেন নয়। জার্মানির (Germany) বাসিন্দা আমাদের বড়ো কন্যা আমাদের সফরসঙ্গী-কাম-পথপ্রদর্শক। সে জানালো সড়কপথে অটো-বান দিয়ে গাড়ি চালিয়ে এলে এত বার ট্রেন বদলের ঝঞ্ঝাট থাকেনা, সময়ও লাগে অনেক কম। তাছাড়া, এই অঞ্চলে কাছাকাছির মধ্যেই রয়েছে আরও কয়েকটি বেশ নামী পর্যটন-কেন্দ্র যথা স্ট্রাসবর্গ, ফ্রেইবুর্গ এবং জার্মানীর সীমান্তে কিন্তু ফ্রান্সে অবস্থিত বাসেল। গাড়ি নিয়ে এলে একদিনেই গেংগেনবাখের সাথেসাথে এই দ্রষ্টব্যস্থানগুলোর একটা-দুটো দেখে নেওয়া যায়, ট্রেনে যাতায়াত করলে যেটা একেবারেই সম্ভব নয়। এবারে বেড়াতে এসে আমরা অবশ্য ট্রেনের এই সফরগুলো প্রাণভরে উপভোগ করছি। লাল, সাদা, হলুদ ইত্যাদি নানা রঙের ট্রেনগুলো দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি নয়নাভিরাম রৌদ্রজ্জ্বল গ্রীষ্মের দিনে রেলপথের দুইপাশে জার্মানীর (Germany) গ্রামাঞ্চলের দৃশ্য, একেবারে ক্যালেণ্ডার বা পিকচার পোস্টকার্ডে ছাপানো ছবির মতো। ব্ল্যাক ফরেস্ট সংলগ্ন গ্রামাঞ্চলের মধ্যে দিয়ে ট্রেনের যাত্রাপথ, কিছুটা পথ চলার পরেই ব্ল্যাক ফরেস্ট তার অস্তিত্বের কথা জানান দিলো। জানলা দিয়ে দেখছি ট্রেনের দুই পাশে সরে যাচ্ছে ঝকঝকে নীল আকাশের পটভূমিতে আঁকা দূরের গাঢ় সবুজ রঙের উঁচু উঁচু ওক আর পাইনের বন, হালকা সবুজ ঘাসের প্রান্তরে ফুটে থাকা হলুদ রঙের সূর্যমুখীর ক্ষেত, শীর্ণ নদীর স্বচ্ছ জলের উপলব্যথিত গতি, নদীর ওপর ছোট্ট ব্রীজ আর মাঝেমাঝেই চোখে পড়ছে ঢালু লাল ছাদের ছোট ছোট বাড়ি দিয়ে সাজানো গ্রাম, বাড়ির বারান্দায় রাখা রঙিন ফুলের টবের সারি, আর বাড়িগুলো ছাড়িয়ে উঠেছে গ্রামের গির্জার উঁচু চূড়া। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় – “রেলগাড়ির জানলা দিয়ে চেয়ে চেয়ে মনে হল, পৃথিবীতে সবুজের বান ডেকেছে; শ্যামলের বাঁশিতে তানের পর তান লাগছে, তার আর বিরাম নেই”। হঠাৎ করে চোখে পড়ছে লোকালয় থেকে অনেকটাই দূরে, জঙ্গলের প্রায় গা-ঘেঁষে সুদৃশ্য ছবির মতো একটাই মোটে বাড়ি, সেই বাড়ির আশেপাশে আর কোনও মনুষ্যবসতির চিহ্নমাত্র নেই। কারা থাকেন প্রকৃতির কোলে ওই একাকী নির্জনবাসে, ঠিক কিরকম হয় তাদের প্রাত্যহিক দিনলিপি, সেকথা জানার বড়ো কৌতুহল হলেও, আপাতত কয়েকটা বাড়ির ছবি তুলেই সে কৌতূহলে ইতি টানতে হলো। এদেশে ট্রেনের জানলার অতবড় কাঁচগুলোতে আঁচড়ের দাগ পড়েনা, দুই পাশে পুরু ধুলোর আস্তরণ নেই আর ময়লা বা গুটখার দাগটাগ তো একেবারেই নেই, কাজেই মোবাইলের ক্যামেরা দিয়ে চলন্ত ট্রেন থেকে পথের পাশের নিসর্গদৃশ্যের কয়েকটা টুকরো ধরে রাখতে বিশেষ অসুবিধে হলোনা। 

জার্মানীর বাডেন-উরতেমবার্গ অঞ্চলে অবস্থিত এই গেংগেনবাখের খ্যাতি মূলত যে দুটি কারণে তার প্রথমটি হলো এখানকার ‘ফ্যাসেনদ’ কার্নিভ্যাল, দীর্ঘ এবং কষ্টকর শীতকাল শেষ হওয়ার পরে অশুভ আত্মাদের শহর থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার জন্যে যখন শহরের অধিবাসীরা কাঠের মুখোশ পরে শোভাযাত্রা করে পথে নামেন। আর দ্বিতীয় কারণটি হলো, ক্রিসমাসের আগে চার সপ্তাহ অর্থাৎ অ্যাডভেণ্ট-এর সময় আসন্ন ক্রিসমাসের প্রতীক্ষায় যে বিশেষ অ্যাডভেণ্ট ক্যালেণ্ডার তৈরি হয়, তখন গেংগেনবাখের টাউন-হলের জানলাগুলোকে সেই অ্যাডভেণ্ট ক্যালেণ্ডারে রূপান্তরিত করা হয়, যেটা পৃথিবীর সবচাইতে বড়ো অ্যাডভেণ্ট ক্যালেণ্ডার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আমরা গেংগেনবাখ এসে হাজির হয়েছি জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে, তখন এইসব উৎসবের সময় নয়। ইউরোপে এইসব ছোট ছোট জায়গা ঘুরে দেখতে গেলে চরণ-যুগলের ওপর ভরসা রাখা ছাড়া গতি নেই, এখানে চুক্তিতে শহর ঘুরিয়ে দেখানোর জন্যে অটো, টাঙ্গা অথবা রিক্সা পাওয়া যায়না। সাহেব-মেমরা অবশ্য অনেকে ট্রেনের কামরায় অথবা গাড়ির মাথায় তাদের সাইকেলটি চাপিয়ে বেরিয়ে পড়েন, গন্তব্যে পৌঁছে তারপর দিব্যি সাইকেল চড়ে ঘোরাঘুরির কাজটা সেরে নেন। স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম ‘আলস্টাড’ বা প্রাচীন শহরের কেন্দ্রস্থলে। পর্যটকদের হালকা ভিড় থাকলেও দেখে মনে হলো এখানে স্থানীয় পর্যটকরাই বেশি আসেন, আন্তর্জাতিক বা বলা ভালো কলরব-মুখর চাইনিজ পর্যটকের দল এখানে একেবারেই অনুপস্থিত। জার্মানীর আরও পাঁচটা মধ্যযুগীয় শহরের মতো এখানে শহরের প্রধান তিনটে রাস্তা এসে মিলেছে শহরের কেন্দ্রে, যেখানে আছে একটা ফোয়ারা, যেটা থেকে একসময় শহরে জল সরবরাহ হতো। এখানেই একদিকে রয়েছে অ্যাডভেণ্ট ক্যালেণ্ডার-খ্যাত সেই প্রাচীন টাউন হলটি। মধ্যযুগে শহরকে রক্ষা করার জন্যে শহরের চারদিক ঘিরে যে প্রাচীর ছিল, তার কিছু অংশ এখনো অক্ষত রয়েছে। এই প্রাচীরের তিনদিকে রয়েছে দরজা সমেত তিনটে নজরমিনার, আগেকার দিনে এই দরজাগুলি বন্ধ করে দিলে শহরে থেকে ঢোকা বা বেরোনোর পথ বন্ধ হয়ে যেতো। শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত বাড়িগুলোর অভ্যন্তরের আধুনিকীকরণ হলেও বহিরঙ্গের পুরাতন চেহারাগুলি অবিকৃত রাখা রয়েছে। শহরের পাথরে বাঁধানো সরু রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দুপাশে চোখে পড়বে এই সব রঙবেরঙের ঢালু ছাদের কাঠের বাড়ি – যেগুলোকে বলা হয় ‘হাফ-টিমবার হাউস’। প্রায় সমস্ত বাড়িরই অলিন্দে শোভা পাচ্ছে কেয়ারি করা নানা রঙের ফুলের গাছ, কোথাও বা মাটি থেকে ওপরে বাড়ির ছাদ অবধি উঠে গিয়েছে লতানো ফুলের গাছ, যা বাড়িগুলোর সৌন্দর্যকে বহুগুণে বাড়িয়ে তুলেছে। নির্দিষ্ট করে কোনও স্থাপত্য, বা কোনও মিউজিয়াম অথবা কোনও রাজপ্রাসাদ বা গির্জা দেখার জন্যে এই শহর নয়, গেংগেনবাখের পথেঘাটে ঘুরে ঘুরে যেটা উপভোগ করতে হয়, সেটা হচ্ছে এই শহরের সেই প্রাচীন মধ্যযুগীয় বাতাবরণ, এই শহরের রমণীয় এক অদ্ভুত পুরোনো আবহ, মনে হবে যেন গ্রিম ভাইদের রূপকথার বইয়ের পাতায় দেখা কোনও একটা জায়গাকে জাদুবলে তুলে এনে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে এই আধুনিক পৃথিবীর মাঝখানে।

হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়লো সবুজ আঙ্গুরলতায় ছাওয়া একটা ছোট টিলার ওপরে একটা অধুনা-পরিত্যক্ত চ্যাপেল, মিনিট কুড়ি হেঁটে উঠতে পারলে ওই টিলার ওপর থেকে গেংগেনবাখ শহরের একটা সুন্দর দৃশ্য চোখে পড়ে, তবে আমাদের পদযুগল ওইটুকু চড়াই ভাঙ্গতেও রাজি হলোনা। পরিবর্তে আমরা দেখলাম শহরের মধ্যে অষ্টম শতকে স্থাপিত গেংগেনবাখ অ্যাবে এবং তৎ সংলগ্ন চার্চ অফ সেন্ট মেরি। এই চার্চের মধ্যে কিছু সুন্দর দেওয়াল চিত্রণ রয়েছে যেগুলো অষ্টাদশ শতকে আঁকা হয়েছিল। আমরা যখন ভেতরে ঢুকলাম, তখন চার্চের অভ্যন্তর একেবারে জনশূন্য, শুধু একজন  তরুণ একা বসে নিবিষ্টচিত্তে চার্চের অর্গানটিতে একটার পর একটা সুর বাজিয়ে চলেছেন। ফাঁকা চার্চের ভিতরে অর্গানের গমগমে আওয়াজ অন্যরকমের একটা পরিবেশ তৈরি করেছিলো, আমরা বেশ খানিকক্ষণ বসে সেই বাজনা উপভোগ করে আবার ফিরে এলাম শহরের কেন্দ্রস্থলে। ব্ল্যাক ফরেস্টের কিনারায় এসে বিখ্যাত ব্ল্যাক ফরেস্ট কেকের স্বাদ না নিয়ে তো আর ফেরা যায়না, তাই একদিনের একটা সুন্দর ভ্রমণের ‘মধুরেন সমাপয়েত’ করা হলো ‘আলস্টাড’-এর রাস্তার ধারে একটা ছোট্ট ক্যাফেতে বসে ব্ল্যাক ফরেস্ট কেক সহযোগে আইসক্রিম দিয়ে। 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here