সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘জঙ্গলের মধ্যে এক হোটেল’ পড়েছেন? সেই যে আফ্রিকার জঙ্গলের মধ্যে একটা হোটেলে গিয়েছিল সন্তু আর কাকাবাবু! ভারতের মধ্যে যদি এমন অভিজ্ঞতা পেতে চান, তাহলে চলে যান বান্ধবগড়ের জঙ্গলে। বান্ধবগড়ে অনেক হোটেল, লজ-এরও অভাব নেই। কিন্তু এসবই জঙ্গলের বাইরে। তবে জঙ্গলের মধ্যে থাকার সুযোগও আছে। সেক্ষেত্রে আপনাকে থাকতে হবে মধ্যপ্রদেশ (Madhya Pradesh) ট্যুরিজিমের ‘হোয়াইট টাইগার ফরেস্ট লজ’এ। নামে ফরেস্ট লজ হলেও আধুনিক হোটেলের সব সুবিধাই আছে। অথচ গাছপালায় ঘেরা। নির্জন গা ছমছমে। লজে দু’রকমের ঘর আছে। কিছু ঘর উঁচু পিলারের উপরে। যা ডুয়ার্সের চিলাপাতায় গাছবাড়িতে কখনও থাকলে, সেই অভিজ্ঞতা মনে পড়াবে। যদিও ফরেস্ট লজ-এর চারিদিক উঁচু বেড়া দিয়ে ঘেরা, তবুও সন্ধ্যের পর বাইরে বেরোতে গেলে বুক ধুকপুক করে। হাজার হোক এটা তো মানুষের রাজত্ব নয়, বন্য ভয়ঙ্কর প্রাণীদের রাজত্ব। 

বান্ধবগড় কিংবদন্তী তার পুরান ঐতিহ্যে। প্রাচীন বান্ধবগড় নিয়ে একটা কাহিনী শোনা যায়। বান্ধব-এর অর্থ ভাই। গড়ের অর্থ কেল্লা। রামচন্দ্র এখানকার কেল্লাটিকে লক্ষণকে উপহার দিয়েছিলেন। এই প্রাচীন গল্পগাছা আপনি বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, ২০০০ বছরের প্রাচীন বান্ধবগড়ে মানুষের তৈরি গুহা এবং পাহাড়ের বুকে আঁকা ছবি দেখার পর আপনাকে অনেক কিছুই ভাবাবে। এক সময় এই এলাকার রাজা ছিল চার্জার। তার সারা গায়ে আগুনে রঙের উপরে ছিল কালো কালো ডোর পর্যটকদের গাড়ির দিকে তেড়ে আসত বলে তার নাম চার্জার। পর্যটকদের বড় প্রিয় ছিল সে। তাই জঙ্গলের মধ্যে যে জায়গায় সে শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছিল, সেই জায়গাটা এখন সাইনবোর্ড দিয়ে চিহ্নিত করা আছে।
আজ চার্জার না থাকলেও তার বংশধররা রাজকীয় মেজাজে বান্ধবগড়ের জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়। তাদের ভয়ে ত্রস্ত হয়ে থাকে পশুপাখি। মানুষদের ওপরে তাদের ভয়ানক রাগ থাকলেও ছুঁতে পারে না। তাই আঙ্গুর ফল টক, যেন দয়া করে ট্যুরিস্টদের ছেড়ে দেয়। কিন্তু রাজার মেজাজ। কখন কী করে বসে, তাই পর্যটকদের গাড়ি থেকে নামতে নিষেধ করা হয়। সারা দেশের মধ্যে মধ্যপ্রদেশের (Madhya Pradesh) জঙ্গলেই বাঘের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বাঘের মৃত্যুতেও  দু’বছরে তারা সারা দেশে সবার আগে। ২৭টি করে ৫৪টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। হোয়াইট টাইগার ফরেস্ট লজে থাকার একটা সুবিধা হল, ঘর বুক করলে জঙ্গল সাফারি বুকিং নিয়ে কোনও মাথাব্যাথা থাকে না।

মধ্যপ্রদেশ (Madhya Pradesh) ট্যুরিজিমই দিনের বেলা চাহিদামত সাফারির সব ব্যবস্থা করে দেয়। বান্ধবগড় সাফারি করে বাঘের দেখা পেলে ভাল। না পেলেও ক্ষতি নেই। আপনি যদি জঙ্গল প্রেমিক হন তাহলে বান্ধবগড় থেকে আপনি অপার আনন্দ আহরণ করতে পারেন। এই জঙ্গলের রূপ অনবদ্য। বিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে কাশের বন, মনে হবে শরৎকালের অপু দুর্গার নিশ্চিন্দিপুর। আর পলাশগাছের বন, বসন্তে কেমন রঙ ধরে তা ভাবলেই মন ভালো হয়ে যায়। এই বনের মধ্যে অসংখ্য ময়ূর, ঝাঁকে ঝাঁকে হরিণ, গাছে গাছে হনুমান। আর কপাল ভাল থাকলে দেখা হয়ে যাবে বাঘের সাথে। 

সাফারির পর লজে ফিরে এসে বসে থাকুন একদম শেষ প্রান্ত ক্রংক্রিট বাঁধানো চত্বরের ওপরে। তার গা ঘেঁষেই চওড়া খাল। তার ওপারেই জঙ্গল। অনেক সময় এখান থেকেই কাকর হরিণ বা বুনো শুয়োর চোখে পড়ে। দেখতে ভালই লাগে। যতক্ষণ ভাল লাগে বসে থাকুন। এরপর লজে ফিরে বিশ্রাম নিয়ে নিজেকে ফুরফুরে করে নিন। এখানে খাওয়ার খরচ ঘরভাড়ার সঙ্গেই ধরা আছে। একেবারে এলাহি খাবার দাবারের ব্যাবস্থা। যা খুশি, যত খুশি খান। কিন্তু ডাইনিং হলে যখন খেতে বেরোবেন, তখন তো অন্ধকার। তাই, গাছপালায় ঘেরা পথে আবার শুরু হয় ধুকপুকুনি। ঝোপের আড়াল থেকে কেউ নজর রাখছে না তো? কেউ ওৎ পেতে বসে নেই তো? হাজার হোক, হোটেলটা জঙ্গলের মধ্যে। আর এটা ডোরাকাটাদের অবাধ রাজত্ব।   

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here