বর্ষায় অনেকে পাহাড় এড়িয়ে যান। কিন্তু বর্ষাতেও পাহাড়ের (specially of Himachal Pradesh) মন কেমন করা আলাদা একটা সৌন্দর্য আছে।   শাহরুখ খানের সেই ‘চল ছাইয়া ছাইয়া’ মনে আছে? কিংবা সইফ আলি খানের ‘ইয়ে হাওয়ায়ে গুনগুনায়ে’? ভোর চারটের সময় যখন কালকা স্টেশনে নামলাম, তখনকার মনের অবস্থা বোঝানোর নয়। চেপে বসলাম ‘শিবালিক’ ট্রয় ট্রেনে। ভোরের অন্ধকারে ওই দূরের পাহাড়ের গায়ে আলো দেখে বেশ রোমাঞ্চিত হচ্ছিলাম। ভাবতেই অবাক লাগছিল যে আমরা নাকি ওই পাহাড় পেরিয়ে আরও অনেক উঁচু পাহাড়ে যাব। ট্রেন তো বেশ ধীর গতিতে তার যাত্রা আরম্ভ করল। একটা অদ্ভূত জিনিস লক্ষ্য করলাম, কালকা স্টেশন এবং কালকা থেকে সিমলার যাত্রাপথে আধুনিকতার কোনও ছোঁয়া নেই। অর্থাৎ ইংরেজরা যেভাবে ওই স্টেশন তৈরি করেছিল এখনও সেভাবেই আছে। তারা যে হাতি ল্যাম্প ব্যবহার করত, সেই ঐতিহ্যের হাতিল্যাম্পই এখনও সিগন্যাল হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
যেতে যেতেই প্রবল বৃষ্টি শুরু হল। ভরা শ্রাবণে একমাত্র পাগল ছাড়া কেউ বেড়াতে বেরোয়! পরক্ষণেই মনে হল, আমাদের মতো ভ্রমণ পাগলরাই বোধহয় বেরোয়। আসলে গতানুগতিক চিন্তাভাবনা থেকে বেরিয়ে গিয়ে যারা ভাবে সমকাল, তাদেরই পাগল বলে। সে বলে বলুক। ততক্ষণে কু- ঝিকঝিক আওয়াজ বেশ নেশা ধরে গেছে। কতগুলো যে টানেল পেরোলো, গুনতেই ভুলে গেছি। তারপর এল পৃথিবীর দীর্ঘতম টানেল। খুব নাচতে ইচ্ছা করছিল। কিন্তু অনেক কষ্টে নিজেকে সামল আমরা সিমলামুখী। কিন্তু গাইতে বাধা কোথায়? গুনগুন করছিলাম ‘তু হ্যায় ফুলো মে কালিওমে, ইয়া মেরি খাঁবো কি গালিওমে’। দেখলাম কৌতুহলী হয়ে লোকজন তাকাচ্ছে। তাতে আমার ভারি বয়েই গেলো।
আমাদের গন্তব্য চিরাচরিত সিমলা (Shimla, Himachal Pradesh) নয়। তার বদলে বেছে নিয়েছিলাম হিমাচল প্রদেশের (Himachal Pradesh) ছোট্ট গ্রাম, কাশৌলী (Kasauli)। ছবির মতো সুন্দর সেই গ্রাম। শীতের পাহাড়কে অনেকেই দেখেছে। কিন্তু বর্ষায় পাহাড়ের অন্য রুপ। বরফে আচ্ছন্ন পাইন গাছে ঘেরা পাহাড় সুন্দর হলেও সে শীতে কুঁকড়ে থাকে। কিন্তু বর্ষার হিমালয় পর্বতমালা যেন নবযুবতী। পাইন গাছের ফাঁক দিয়ে মেঘ নেমে আসছে রাস্তায়। মাঝ রাস্তায় ট্রেন থামলে গরম কফি আর প্যাটিস মন্দ লাগল না। মেঘের সাদা চাদর মুড়ি দিয়ে আমরা নামলাম কুমারহাটি (Kumarhati) নামের একটা স্টেশনে। সেখান থেকে গাড়িতে করে কাশৌলী (Kasauli)। প্রথমে বেশ মজাই লাগছিল। কিন্তু পথ যখন ক্রমশঃ ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার হে’ হতে লাগল, তখন নিজের অজান্নতেই একটা মৃত্যু ভয় কাজ করছিল। ভাবছিলাম পালকের মতো শুন্যে ভাসতে ভাসতে যদি…ড্রাইভারের হাসিতে সম্বিত ফিরে পেলাম।
হিমাচলের (Himachal) ড্রাইভাররা নাকি পাহাড়ী পথে গাড়ি চালাতে সবচেয়ে পারদর্শী। সে আমাকে আশ্বস্ত করল- ‘ব্যাহেনজি আপকো ডরনেকি কই জরুরত নেহি’। আমিও তার কথায় আশ্বস্ত হয়ে হাসলাম। এমন সময় দেখি ওই দুর্গম এলাকায় কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ের স্কুল বাস। বাসের ভেতর যারা ছিল, তাদের প্রত্যেকেরই বয়স আড়াই থেকে তিন বছর। এরা যদি এখানে আসতে পারে, তবে আমি কেন বেড়াতে আসতে পারি না!
গাড়ি থেকে যখন নামলাম তখন বৃষ্টি হয়ে গিয়ে মেঘ কেটে একেবারে পরিষ্কার আকাশ। পাইন গাছে ঘেরা কাঠের তৈরি সুন্দর কটেজ দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। ব্যালকনি থেকেই ওপারে দেখা যাচ্ছে বরফে ঢাকা তিব্বত (Tibet)। শোয়েটার বা চাদরের প্রয়োজন না থাকলেও স্নান করতে গিয়ে বুঝিয়ে দিল- ‘আমি যে সে জল নই। বরফ গলা জলে পুষ্ট আমি হিমালয়ের জল’। পেল্লাই সাইজের আলুর পরোটা আর টকদই দিয়ে সকালটা বেশ ভালই কাটল। দুপুরেও সুখাদ্য। ভাত, ডাল আর সিমলা মির্চ-এর তরকারি। মাছ, মাংস খেতে হিমাচলের (Himachal) লোকেরা মোটেই পছন্দ করে না। ডালটাই তাদের প্রিয় খাদ্য।
বিকেলে গেলাম দাগসাই। হেরিটেজ মিউজিয়ামে। সেখানে তিনদিন মহাত্মা গান্ধীকে কয়েদ করে রাখা হয়েছিল। জেলের পুরোটাই কাঠের তৈরি যাতে কয়েদিরা কেউ হেঁটে গেলে নিরাপত্তা রক্ষীরা সহজেই বুঝতে পারে। যে জেলটিতে মহাত্মা গান্ধীকে রাখা হয়েছিল সেটা এতটাই ছোট যে কেউ বসতে পারবে না। তাঁকে দাঁড়িয়েই থাকতে হবে। ফিরে আসছি। হঠাৎ চোখে পড়ল অজস্র নাসপাতি আর বেদানা গাছ। তাতে থোকা থোকা নাসপাতি আর বেদানা ধরে আছে। বেদানা তখনও সাবালক হয়ে ওঠেনি।

কিন্তু নাসপাতি তখন সদ্য যুবক। হিমাচলের লোক নাবালক, সাবালক, যুবক নাসপাতি  বা বেদানাকে পাত্তাই দেয় না। কিন্তু তাই বলে আমরা বংবাসীরা পাত্তা দেব না, সেটা কি করে হয়? প্রায় জোর করে মাঝরাস্তায় গাড়ি থামিয়ে নাসপাতি পাড়তে শুরু করলাম – ‘আহা কি আনন্দ নাসপাতি পাড়তে’। পরের দিন সকালে সেই ড্রাইভার ভাইসাহাব প্রায় দশ কেজি নাসপাতি বাড়ির গাছ থেকে পেড়ে আমাদের কটেজে এসে দিয়ে গেল। ভাবা যায়! ভাবা যায় না বলেই খুব লজ্জা পেয়ে গিয়েছিলাম।

পরের দিন গন্তব্য মাঙ্কি পয়েন্ট। পুরো অঞ্চলটা এয়ার ফোর্সের আওতায়। মোবাইল, ক্যামেরা ড্রাইভারের কাছে গচ্ছিত রেখে নির্দিষ্ট পরিচয়পত্র দেখিয়ে ভেতরে গেলাম। মাঙ্কি পয়েন্টের মাহাত্ম্য- পবনপুত্র হনুমানজি লক্ষণের জন্য বিশাল্যকরণী নিয়ে যাবার সময় এই পর্বতের ওপরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করেছিলেন। তাই সেখানে তাঁর একটি পায়ের ছাপ আছে। মাহাত্ম্যটা দেখার প্রবল ইচ্ছা হল। শুধু ধর্মভীরু বলে নয়, মনের মধ্যে একটা সুপ্ত ইচ্ছেও ছিল। মনে মনে বললাম, ‘যাই এসেছি যখন দেখেই আসি- কি আছে ওখানে’। ঘন্টা বাজিয়ে প্রবল বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে আমাদের যাত্রা শুরু হল। পর্বতের গায়ে লেখা ‘৬২৭০ ফুটে’ আমরা আছি। পাহাড় কেটে কেটে সিঁড়ি থাকলেও রাস্তা কিন্তু মোটেও অল্প নয়। যতবারই ওপরে মন্দিরের দিকে তাকাই ততবারই মনোবল ভেঙ্গে যায়। নাঃ। আর পারছি না। কিন্তু শরীরকে উপেক্কা মন বলছে ‘চল’। মনের জোর বাড়ানোর জন্য পর্বতের গায়ে মাঝে মাঝেই হিন্দিতে লেখা – ‘জয় বজরংবলি, তোড় দে দুশমন কি গলি’।
‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ এর  সেই গান – কতদূর আর কতদূর… মনে পড়ছিল। ওদিকে আমার দুর্দশা দেখে লালমুখ বাঁদরগুলো মনের আনন্দে বিদ্রূপ করছে। অবশেষে যখন পৌঁছলাম তখন দেখলাম অত উঁচু থেকে নিচের কোনও কিছুই দৃশ্যমান হচ্ছে না। আমরা এখন মেঘেদের রাজ্যে। এটাকেই বোধহয় স্বর্গ বলে। কি মনোরম সেই দৃশ্য।
সমস্ত পথশ্রমের ক্লান্তি প্রকৃতি এক নিমেষে তার সৌন্দর্য দিয়ে ভুলিয়ে দিল। অক্সিজেনের পর্যাপ্ত ঘাটতি থাকা সত্বেও ভোগ প্রসাদ কিনে পুজো দিলাম। এখানে প্রসাদরূপে ঠাকুরকে দেওয়া হয় মুড়ি, ছোলা আর নকুলদানা। মন্দির চত্বরে রয়েছে সেই মৃতসঞ্জীবনী গাছ। হনুমানজি ওইখানে একটা পা দিয়ে বিশ্রাম করেছিলেন তো বুঝলাম, কিন্তু আরেকটা পা? সেটা নাকি সিমলার জাকুতে দিয়েছিলেন। সত্য সেলুকাস! কি বিচিত্র এই হনুমানজি।
সেখান থেকে নেমে এসে এক কাপ গরম চায়ে নরম চুমুক মেরে গেলাম বহু পুরনো বৃটিশ আমলের একটা চার্চে। শান্ত মন আরও শান্ত হয়ে গেল। সেখান থেকে গেলাম সুইসাইড পয়েন্ট। না আমার সুইসাইড করার ইচ্ছা নেই। কিন্তু দেখতে ক্ষতি কি? গাড়ি থেকে নেমে পাহাড়ি পথের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে সেই জীবন-মৃত্যুর সীমানায় এসে দার্শনিক হওয়াটাই স্বাভাবিক। ওখানে পাহাড়ের ঢাল খাড়া ভাবে নেমে গেছে। ‘টোপ’ গল্পটা পড়া থাকলে পাঠকের বুঝতে সুবিধা হবে। অত সুন্দর জায়গায় গিয়ে কেন যে মানুষ… যাই হোক, এরপর গেলাম সানসেট পয়েন্ট। সেখানে অবশ্য সুর্যিমামা দেখা দিলেন না।
তিনি তখন মেঘেদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলায় ব্যস্ত। তাই ওখান থেকে চলে এলাম। আসার পথে দেখলাম পাহাড়ের কোলে ভুট্টা বিক্রি হচ্ছে। উনুনের আয়োজন নিতান্তই সামান্য। দু’চারটে কাঠকয়লার ওপর লোহার জালতি দিয়ে ভুট্টা পোড়ানো হচ্ছে। পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে সেই ভুট্টাই তখন পরম উপাদেয়। এরপর ঘরে ফেরার পালা। পথেই একজায়গায় গাড়ি থামিয়ে খেয়ে নিলাম মোমো । উদর পরিতৃপ্তি করে নিজেদের ডেরায় ফিরে এলাম। রাত্রিরে আবার সেই ডাল, ঘি দেওয়া মোটামোটা রুটি আর স্যালাড; সঙ্গে টক দই। প্রথম প্রথম খেতে ভালোই লাগছিল। কিন্তু মাছে-ভাতে বাঙালি। কাঁহাতক ওই ডাল রুটির অত্যাচার সহ্য করবে! কিন্তু কিছু করার নেই। এ যেন পড়েছ হিমাচলীদের হাতে/ রুটি খেতে হবে সাথে।
পরদিন সকালে মুলোর পরোটা আর আদার চাটনি খেয়ে রওনা হলাম সোলান ভ্যালির (Solan Valley) উদ্দেশ্যে। কাশৌলীর (Kasauli) মতো শান্ত, নির্জন নয়। অনেক বেশি সুসজ্জিত ও আধুনিক। সেটাই তার সৌন্দর্য। এখানেই দেখা মিলল সোনার আপেলের। অত চমকানোর কিছু নেই। সোনার ডিম হতে পারে, আর সোনার আপেল হতে পারে না? আসলে সেই আপ্লের গায়ের রঙ সোনার মতো। স্বাদে গন্ধে অতুলনীয়। অল্পেতে স্বাদ মেটে না। এ স্বাদের ভাগ হবে না। এতদিন যে আপেল খেয়ে আমরা অভ্যস্ত; অর্থাৎ বালি বালি খেতে, রুগী রুগী গন্ধ বলে নাক সিঁটকিয়েছি, এ কিন্তু মোটেই সেরকম নয়। বেশ রসাল। হালকা টক। দামও বেশ কম। তাই এর নাম গোল্ডেন আপেল (Golden Apple)।
টুকটাক বাজার করে ক্লান্ত হয়ে গেলে, খেয়ে নিন হিমাচলের (Himachal) ফুলকি (Known as Phuchka in West Bengal, and as Panipuri in many other parts of India)। একটা খেলে আরেকটা আপনাকে খেতেই হবে। অনেক ঘোরা হয়েছে। এবার মন চল নিজ নিকেতনে। সবমিলিয়ে দেবভূমি হিমাচলের সেই ছোট্ট গ্রামের অমলীন স্মৃতি আজও নতুনের মতই চিরনতুন।

কীভাবে যাবেন

হাওড়া থেকে কালকা মেলে কালকা স্টেশন (Kalka Station)। সেখান থেকে ট্রয় ট্রেনে নিজের গন্তব্যস্থল। এছাড়া হিমাচলের স্টেট বাসেও যেতে পারেন। আবার যে কোনও ট্রেনে দিল্লি পর্যন্ত গিয়ে ভলভো বাসেও যেতে পারেন। কোথায় থাকবেন- পুরো হিমাচল (Himachal) জুড়েই অসংখ্য সুন্দর সুন্দর হোটেল আছে। কোন জায়গায় থাকবেন সেটা ঠিক করে নিয়ে হোটেল বুক করতে পারেন। 

কী খাবেন- পশ্চিমের যে কোনও পাহাড়ি এলাকায় মোমোই প্রধান খাদ্য। এছাড়া আলুর পরোটা দিয়ে টকদই অবশ্যই খাবেন। পথে যেতে যেতে ভুট্টা খেতেও মন্দ লাগবে না। গোল্ডেন আপেল খেতে একদমই ভুলবেন না। এছাড়া, পাহাড়ের ধারে ফ্রি নাসপাতি আর বেদানাও যত ইচ্ছা খাবেন।  

কী খাবেন

পশ্চিমের যে কোনও পাহাড়ি এলাকায় মোমোই (Momo) প্রধান খাদ্য। এছাড়া আলুর পরোটা (Alu Paratha) দিয়ে টকদই অবশ্যই খাবেন। পথে যেতে যেতে ভুট্টা খেতেও মন্দ লাগবে না। গোল্ডেন আপেল (Golden Apple) খেতে একদমই ভুলবেন না। এছাড়া, পাহাড়ের ধারে ফ্রি নাসপাতি আর বেদানাও যত ইচ্ছা খাবেন।  

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here