গোবরে পদ্মফুল কথাটা শুধু মাত্র কথার কথাই হবে হয়তো, কারণ আমি কখনো গোবরে পদ্মফুল দেখিনি তবে বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলায় পানিতে পদ্মফুল দেখেছি। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত জেলা গোপালগঞ্জে  (gopalganj, Bangladesh) প্রাকৃতিক-ভাবে জন্ম নেওয়া লাল-গোলাপি ও সাদা পদ্মফুল সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে গোপালগঞ্জের পদ্ম-বিলের (poddo bil)। 

দূর থেকে তাকালে মনে হবে বিলে কেউ যেন ফুলের বিছানা পেতে রেখেছে। এ যেন পদ্ম-মেলা। গোপালগঞ্জের জলের রানি পদ্মফুলের বিলে পর্যটকদের আনাগোনায় এখন মুখরিত। প্রতিদিনই প্রকৃতির এই অপরূপ শোভা উপভোগ করতে আসছেন সৌন্দর্য পিপাসুরা। গোপালগঞ্জ জেলা সদর থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বদিকে এ বিল (poddo bil)অবস্থিত।
 
স্থানীয়রা জানান, আগে বিলে অল্প কিছু পদ্ম ফুটত। ১৯৮৮ সাল থেকে বর্ষাকালে বিলে প্রাকৃতিক-ভাবেই হাজারো রংবেরঙের পদ্ম ফুটতে থাকে। পরে আস্তে আস্তে লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে এই পদ্ম-বিলের (poddo bil) কথা। বলাকইড় গ্রামের পদ্ম-বিলের প্রায় পুরোটাতেই ফোটে অসংখ্য পদ্মফুল। আর আকাশে সূর্য উঁকি দেওয়ার পরপরই বিলে আসেন পর্যটকরা। আর তাঁদের আনাগোনা চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত।
Poddo bil
গোপালগঞ্জের (gopalganj) অধিবাসী হয়েও কখনো যাওয়া হয় নি এই বিল দেখতে। তাছাড়া খুব কম মানুষই এটার ব্যাপারে জানে কিন্তু যারা একবার এসেছে তারা নাকি বার বার যেতে চায় সেখানে। সেখানে নাকি যতদূর চোখ যায় শুধু পদ্ম ফুল আর পদ্ম ফুল। তাই বন্ধুরা মিলে যাওয়ার পরিকল্পনা চলছিল বেশ কিছু দিন ধরেই। 

ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস শেষে সবাই মিলে ঠিক করলাম পদ্ম-বিল (poddo bil) যাবো। যেমন ভাবা তেমন কাজ কিন্তু আমার কাছে মাত্র ৭০ টাকা ছিল! বন্ধুরা বলল আরে তোর কাছে টাকা নেই বলে তুই  যাবি না, আমরা থাকতে এমন তো হবে না। ব্যাস তাদের উস্কানিতে ছুটলাম পদ্ম-বিল ৩০ জন মিলে, তাও দুপুর ২ টো বাজে।

ইউনিভার্সিটি বাসে গোপালগঞ্জ বেত-গ্রাম পর্যন্ত আর তারপর স্থানীয় ভাষায় অটো গাড়ি ভাড়া করে গন্তব্যে। বেত-গ্রাম থেকে ৪০ মিনিট মতো লেগেছিল যেতে কিন্তু সেখানে পৌঁছে নামার পর অনেকেই সন্তুষ্ট হতে পারলাম না। চারদিকে শুধু মাত্র বিলের পানি। তবে যেটা ছিল অনেক ডিঙ্গি নৌকা। আর এসব নৌকা ভাড়া করেই যেতে হয় বিলের গভীরে যেখানে নাকি পদ্মফুলের জন্য পানি দেখা যায় না। 


আপনি দেশের অনেক সুন্দর সুন্দর জায়গা ভ্রমণ করেছেন, বিখ্যাত সেসব জায়গা হয়তো আপনার চোখ জুড়িয়ে দিয়েছে কিন্তু পদ্ম-বিল (poddo bil) এলে আপনার বিশ্বাস হয়ে যাবে গ্রাম আসলেই সুন্দর হয়। আমরা খুঁজে খুঁজে খুব বড় একটা নৌকা ভাড়া করলাম যাতে সবাই একসাথে যেতে পারি। নৌকা কিছুটা যেতেই চোখে পড়লো দূরে গোলাপি, সাদা, লাল রঙের কিছু একটা দেখা যাচ্ছে! 

আর তারপর যখন এসে পৌঁছেছি মাঝ বিলে যতো দূর চোখ যায় শুধু মাত্র পদ্মফুল আর পদ্মফুল আর ভ্রমণকারীদের নৌকা। পদ্মফুল গুলো দেখলে হাত নিশপিশ করবে হাতে তুলে নিতে। প্রথমে যারা হতাশ হয়েছিলাম তারা যেন নিজেদের চোখ কে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। তখন মনে হচ্ছিল আসলেই এটা গোবরে পদ্ম। কি আর বলতাম পদ্ম ফুলের জন্য তো পানি দেখা যাচ্ছিল না।


বেলা পড়ে এলে আমরা মাঝ বিলে গিয়ে পৌঁছলাম। আমাদের একজন ভাল গান জানতো সে গান ধরলো। এক প্রেমিক প্রেমিকার জুটি ছিল ছিল তারা নৌকার একেবারে সামনে গিয়ে টাইটানিক পোস নিয়ে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে লাগলো। এদিকে সেটা দেখে হাসিতে ফেটে পরেছে সবাই। অনেকে ফুল তুলে নিয়েছে ৫০/৬০ টা, হিসাব করলে পদ্মবিলে কয়েক লক্ষ পদ্মফুল হবে। 


সূর্য প্রায় ডুবে এলে আমরা ফিরে আসতে শুরু করলাম। বেশ অনেকটা দূরেই গিয়েছিলাম আর আমাদের ভাড়া করা অটো গুলো দাঁড়িয়ে ছিল আমাদের অপেক্ষায়। যখন ফিরে আসছি সাই সাই করে অটো ছুটছে আমি মুখ বের করে দিয়ে আরো একবার দেখে নিচ্ছিলাম বিলটা (poddo bil)। অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে এলো,
 
বহুদিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে
     বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে,
         দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা
             দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু।
 
 দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
     ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া,
         একটি ধানের শিষের উপর
             একটি শিশির বিন্দু
সাদিকা সুলতানা
সাদিকা পেশায় কৃষিবিজ্ঞানের স্নাতক স্তরের ছাত্রী। গোপালগঞ্জের নিবাসী সাদিকা বাংলাদেশ বিষয়ক লেখালিখির ব্যাপারে আমাদের অন্যতম বিশেষজ্ঞ। নিজের দেশের প্রতি সাদিকার গভীর ভালোবাসা তার প্রতিটা লেখায় বারবার ফুটে ওঠে। ওর লেখাপড়ার বিষয়টি মাটির খুব কাছাকাছি হওয়ায় সাদিকার সাথে গ্রামবাংলার পরিচয় গভীর, আর লেখায় মাটির টান। উনি অবসর সময়ে ঘুরতে আর লেখালিখি করতে ভালোবাসেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here