জীবনে কক্সবাজার যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে দুইবার। প্রথমবার গেলাম সেই ছোট্ট থাকতে, ক্লাস ফাইভে পড়ি আমি তখন। বাবা-মা কে ছেড়ে নানাভাইয়ের সাথে বের হয়ে পড়লাম লম্বা এক ভ্রমণে। সাতদিনের সেই ভ্রমণের মাঝে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল কক্সবাজারেও। আর দ্বিতীয়বার যাই ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষে থাকতে, কলেজের বন্ধুদের সাথে পিকনিকে।

ইংরেজ অফিসার ক্যাপ্টেন কক্স ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে এখানে একটি বাজার স্থাপন করার পর থেকে জায়গাটির নাম হয়ে যায় কক্সবাজার। বিশ্বজোড়া মানুষের কাছে কক্সবাজার সুপরিচিত পৃথিবীর সবচাইতে লম্বা অবিচ্ছিন্ন সমুদ্র সৈকত হিসেবে। প্রায় ১২২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সমুদ্র সৈকত প্রকৃতির এক অপূর্ব উপহার। 

সম্প্রতি কক্সবাজার থেকে বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণের থানা টেকনাফ পর্যন্ত সমুদ্র সৈকত ধরে মেরিন ড্রাইভ নামে এক চমৎকার হাইওয়ের উদ্বোধন করা হয়েছে। সুন্দর এই রাস্তাটি এতটাই অপার্থিব যে তা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা প্রায় অসম্ভব! পিচঢালা মসৃণ পথের একপাশে উঁচু পাহাড় আর অন্যপাশে দিগন্তবিস্তৃত সমুদ্রের জলরাশি আপনাকে যেন নিয়ে যাবে এক অবাস্তব পৃথিবীতে।

বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ হলো এই কক্সবাজার। বেশ কিছুদিন আগে যখন দেশের পর্যটন সেক্টর এতটা সমৃদ্ধ ছিলো না তখন সারাদেশের মানুষের ভ্রমণের সবচাইতে আকর্ষণীয় স্থান ছিল এই সমুদ্র সৈকত। ভ্রমণের পাশাপাশি এখানে আপনি পাবেন নানান প্রকার সামুদ্রিক খাবার। কক্সবাজারের কাছেই মায়ানমার বর্ডার থাকায় বহু বার্মিজ সামগ্রীর দেখা মিলে যাবে কক্সবাজারের মার্কেটগুলোয়। তাই যারা কেনাকাটা করতে ভালবাসেন তাদের জন্যও অনেক চমক নিয়ে অপেক্ষা করছে সমুদ্রপাড়ের এই জেলাটি।

কক্সবাজারের সবচাইতে মনোমুগ্ধকর ব্যাপারটি হলো এর বিচিত্রতা। আকারে অনেক লম্বা হওয়ায় একেক জায়গায় একেক রকমের সৈকত দেখতে পাওয়া যায়। শহর থেকে যেই সৈকতগুলো কাছে স্বভাবতই সেসব জায়গায় মানুষের ঢল নামে। কিন্তু শহরের একটু বাইরের দিকের সৈকতগুলোতে জনসমাগম খানিকটা কম। 

শহরের কাছাকাছি সৈকতগুলোর মাঝে কলাতলি বিচ ও সুগন্ধা বিচ অন্যতম আর শহর থেকে একটু দূরে গিয়েই মিলবে ইনানী সৈকত। সারা বছর জুড়েই জনসমাগম হয় এই এসব জায়গায়। বলে রাখা ভাল, বাংলাদেশের দক্ষিণের এই সমুদ্র সৈকত থেকে শুধুমাত্র সূর্যাস্তটাই দেখা যায়। প্রথমবার কক্সবাজার গিয়ে আমি ভোরের আলো ফোঁটার আগেই সৈকতে যেয়ে হাজিরা দেই। আমাকে অবাক করে দিয়ে সূয্যিমামাটা কীনা উঠলো সৈকতের একদম উল্টোদিক দিয়ে! সকালে ওঠার কষ্টটার পুরোটাই বৃথা।

আমার কাছে সারা বাংলাদেশের সবচাইতে সুন্দর জায়গাগুলোর একটি হল কক্সবাজারের হিমছড়ি। জায়গাটি কক্সবাজার মূল শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে। এখানে প্রায় হাজারখানেক সিঁড়ি বেঁয়ে আপনাকে উঠতে হবে হিমছড়ি পাহাড়ের উপর। এই পাহাড়ে উঠতেই আপনি দেখতে পাবেন দিগন্তজোড়া পাহাড়ের পর পাহাড়, যেন চলে এসেছেন সিলেট-মেঘালয় সীমান্তের কোল ঘেঁষে থাকা অঞ্চলগুলোতে। 

আবার যখনই পেছনে ঘুরে দাঁড়াবেন, সামনে পড়বে বঙ্গোপসাগরের সীমাহীন নীলাভ জলরাশি। প্রথমবার আমি যখন এই পাহাড়ের উপর উঠে দিগন্তের দিকে তাকিয়েছিলাম তখন ছিল ভর দুপুরবেলা। এই কড়া রোদের পাহাড়ে উঠে আমি নিতান্তই ক্লান্ত। কিন্তু দুচোখ মেলে যখন সমুদ্রের দিকে তাকালাম, মনে হচ্ছিল জীবন যেন এখানেই সার্থকতা পেয়ে গিয়েছে। দুপুরের রোদ সমুদ্রের জলের উপর পড়ে একদম নিখাঁদ সোনার জ্বলজ্বল করছিলো। চোখ বুজলে যেন এখনো ওই সময়টাতে ফিরে যাই।

সারা বাংলাদেশ থেকেই কক্সবাজারে সহজ যাতায়াতের ব্যবস্থা রয়েছে। সড়কপথ ও আকাশপথে সরাসরি ঢাকা থেকে কক্সবাজারে পৌঁছুতে পারবেন। আর রেলপথে যেতে চাইলে প্রথমে রেলে চট্টগ্রাম পর্যন্ত এসে সেখান থেকে আলাদা বাসে কক্সবাজার আসতে হবে, যেটি কীনা বেশ সময় ও শ্রমসাপেক্ষ। অনেক ভাল ভাল বাস চলাচল করে এই রুটে, তাই সড়কপথটাই খরচ ও্ আরাম আয়েশের দিক থেকে সবার প্রথম পছন্দ।

থাকার ব্যবস্থাও অনেক ভাল কক্সবাজারে। কম খরচের জায়গা থেকে শুরু করে পেয়ে যাবেন পাঁচ তারকা হোটেলও। তবে ছুটির মৌসুমে একটু আগেভাগেই হোটেল বুক করা ভাল কেননা অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত হোটেল না পেয়ে অতিরিক্ত পয়সা খরচ করা লাগতে পারে। তবে যাই হোক না কেন, ঘুরে দেখুন কক্সবাজার। সমুদ্রপাড়ের এই জেলাটি আপনাকে মুগ্ধ করতে বাধ্য!

সাদিকুল্লাহ মাহমুদ
ফুলটাইম বিজনেস স্টুডেন্ট, পার্টটাইম ট্রাভেলার। ভালবাসি ক্যামেরার চোখে পৃথিবীটাকে দেখতে এবং নতুন মানুষদের সাথে পরিচিত হতে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here