চারপাশে সবুজ ঘন জঙ্গল, তার আদিমতা, বাতাসে মাতাল করা বুনো ফুলের গন্ধ, অজানা পাখির ডাক অথবা বর্ষাস্নাত গাছের পাতার  মোহময় রোদ্দুরের খেলা অথবা প্রচণ্ড দাবদাহে অরণ্যে হুতাশন কিংবা নিস্তব্ধ নিস্তরঙ্গ অরণ্যে ঝরে পড়া পাতার শব্দ বা যদি হিংস্র বন্য জন্তুর মুখোমুখি হতে চান তো ঘুরে আসুন ডুয়ার্সের চিলাপাতা (Chilapata) গহীন অরণ্যে। 
 
চিলাপাতা বন নামকরণ হয়েছে কোচবিহারের (Coochbehar) কোচ রাজবংশের সাহসী যোদ্ধা ও সেনাপতি চিলা রায়ের নামানুসারে। কথিত আছে তিনি নাকি চিলের মতো ছোঁ মেরে শত্রু নিধন করতেন। সেই থেকে এই অরণ্য মহল্লার নাম হয় চিলাপাতা। 
 
জঙ্গলের বেপরোয়া আদিম আকর্ষণে গত ছুটিতে সপরিবারে খাগড়াঘাট স্টেশন থেকে সোজা আলিপুরদুয়ার (alipurduar)৷ স্টেশন থেকে আমরা দু’পরিবার ছোট গাড়িতে বেরিয়ে পড়লাম, গন্তব্য চিলেপাতা জঙ্গল, দূরত্ব মাত্র কুড়ি কিমি। শহর ও লোকালয় পেরিয়ে সুন্দর করে সাজানো চা বাগানের মধ্যে দিয়ে প্রায় দু’ঘন্টা পর পৌঁছে গেলাম আমাদের ঠিকানায়, গ্রীন ভিউ হোটেল
হোটেলের ব্যালকনি থেকে যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু  ঘন সবুজ অরণ্য,দিগন্তবিস্তৃত। কেয়ারটেকার বিল্লু , স্থানীয় আদিবাসী, বয়স চল্লিশের কোঠায়, আমাদের বলল, “বাবু আপনারা রেডি হোন। জঙ্গলের পথ দিয়ে যাবো তোর্সা (torsa) নদী দেখতে।” 

বিল্লুর হাতে একটা নেপালি বড়ো ভোজালি আর তার সঙ্গী পোষা কুকুর টাইগার। বিল্লুর নিরাপদ হাতে আমার ছোট্ট মেয়ে। সবাই চুপচাপ, নিজের শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দও শোনা যাচ্ছে। ঘন গভীর জঙ্গল, চেনা অচেনা গগণচুম্বি গাছপালা সারিবদ্ধভাবে মাথা উঁচু করে শাখাপ্রশাখা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে।
জঙ্গলের মধ্যে সরু পায়েচলা পথ। জঙ্গলি কুল, খয়ের গাছের বন একের পর এক পেরিয়ে  চলেছি। মাথার উপর সূয্যিমামা তখন স্বমহিমায়। কিছুটা যাওয়ার পর হঠাৎ দেখি সামনে হাতির বিষ্ঠা এদিক সেদিক ছড়ানো, একদম তাজা। তারমানে এই মাত্র হাতির দল এই পথ দিয়ে গেছে। একটু এগোতেই লেপার্ডের পায়ের স্পষ্ট পায়ের ছাপ। 

বুকের রক্ত হিম হয়ে গেলো। আমার স্ত্রী লিপিকা তো আর কোন মতেই যেতে রাজি নয়। দূর থেকে তোর্সাকে দেখা যাচ্ছে। চিকচিক করছে সাদা বালির চর, নদীর জলের উপর রোদের ছটা ঝিকমিক করছে। তোর্সার ওপারে জলদাপাড়া অভয়ারন্য। বিল্লু অনেক করে বোঝাল কিন্তু আমরা আর যেতে রাজি নই। দ্রুত পায়ে ফিরে আসলাম হোটেলে। বুঝলাম বিল্লু ভীষণ ক্ষুন্ন হয়েছে।
রাতে হোটেলে বন মুরগির ঝোল ভাত খেয়ে গুটিশুটি মেরে ঘুম। ভোর চারটেয় উঠে আমরা সবাই রেডি জিপ সাফারির জন্য। গত রাতেই সাফারির টিকিট বুকিং করা হয়েছিল। হুডখোলা জিপসি জিপে উঠে বসলাম আমরা ছয় জন। গাড়ি জঙ্গলের ভেতর দিয়ে চলছে। গাইড রামু, স্থানীয় ছেলে, শিক্ষিত, বয়স ২৫-২৬ বছর, কোমরে অভয়ের প্রতীক নেপালি ভোজালি। ভীষণ ঘন জঙ্গল ,গাছের ডালপালা শাখা বিস্তার করে আকাশ ঢেকে দিয়েছে।

ভোরের আলো একটু ফুটতেই বিচিত্র বর্ণের ময়ূরের দল,রং বেরং এর বন মুরগি আর বুনো শুয়োর। কয়েকটি হগ হরিণের চকিত চাহনি, পরমূহুর্তেই জঙ্গলে দৌড়। কিছুটা এগোতেই  দেখি একটা ভগ্নস্তুপ, এটি নলরাজার গড়, চিলাপাতার জঙ্গলের অন্যতম প্রধান আকর্ষন। সংরক্ষণ ও যত্নের অভাবে প্রায় ধ্বংসাবশেষ। কথিত আছে ভূটান রাজার আগ্রাসনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য কোচবিহারের মহারাজার সৈন্যরা এই সুরক্ষিত দুর্গে থাকতো এবং বানিয়া নদী দিয়ে যাতায়াত করতো। দুর্গের চারপাশে আছে রামগুনা গাছ, যে গাছে আঘাত করলে রক্তের মত লাল রস নিসৃত হয়।
বেশ কিছুক্ষণ পর তোর্সা নদীর তীরে ওয়াচ টাওয়ারে পৌঁছালাম। নদীর ওপারে ঘাসের জঙ্গলে আবৃত জলদাপাড়া অভয়ারণ্য (Jaldapara Sactuary)। ওয়াচ টাওয়ারে উঠে অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও কোন হিংস্র জন্তু দেখতে না পেয়ে বিফল মনে ফিরে আসছি। হঠাৎ গাইডের ইশারায় পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি জঙ্গলের ভিতর দিয়ে একটা দাঁতাল হাতি দ্রুত হেঁটে চোখের নিমেষে জঙ্গলে মিশে গেল। আবার গাড়ি চলতে শুরু করেছে। 

ঘন জঙ্গলের আলোআধারিতে আমরা সবাই ফিসফিস করে কথা বলছি, যেন ভুতুড়ে জায়গা। কোর এরিয়ার শেষ প্রান্তে চলে এসেছি। এমন সময় বাঁদিকে পঞ্চাশ  মিটার দূরে দেখি বিরাট আকৃতি দুটো বাইসন(Bison/Gaur) একে অপরের থেকে দশ ফিট দূরে মাথা নিচু করে যুদ্ধংদেহী অবস্থায়।কাছে পিঠে আরো চারটে বাইসন। গাইডের ইশারায় সবাই নিশ্চুপ। 

সে এক দম বন্ধ করা রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা। প্রায় দশ মিনিট পর বাইসন দুটো আস্তে আস্তে জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেলো। শেষ হলো জঙ্গল সাফারি। এক রাশ রোমাঞ্চকর স্মৃতি নিয়ে হোটেলে ফিরে স্নান খাওয়া সেরে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here