এক দিনের ছুটিতে মন চাইলে ঘুরে আসুন কামারপুকুর (Kamarpukur) ও জয়রামবাটী (Jayrambati)। শান্তির খোঁজে একেবারে ভিন্ন স্বাদের ঠাকুরের জন্ম ভিটে কামারপুকুর (Kamarpukur)। কামারপুকুরের থেকে এই জায়গাটির নামকরণ হয়েছে। ঠাকুরের বাণী “যত মত তত পথ”। মানুষের অন্তরে পরমহংসর এই বাণী মিশে রয়েছে ।এই মতের মধ্যে দিয়ে তিনি সব ধর্মের মানুষকে পথের দিশা দেখিয়ে গেছেন।

ঠাকুর রামকৃষ্ণের জন্ম ভিটে কামারপুকুর (Kamarpukur) ঘুরে দেখলে তাঁর জীবন যাপন কতটা স্বাভাবিক ছিল তা বোঝা যায়।সারাবছর খোলা থাকার জন্য যে কোন সময় পর্যটকরা কামারপুকুর, জয়রামবাটিতে (Jayrambati) ইচ্ছেমত বেড়াতে যেতে পারেন। ঠাকুরের ছেলেবেলা, ছাত্রজীবন, খেলাধুলা সব স্মৃতি কামারপুকুরের মঠের সঙ্গে জড়িত। 

তবে মঠ ঘোরার কিছু সময়সীমা আছে। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাস সকাল ৯টা থেকে ১১:৩০, বিকেল ৪ থেকে ৯ টা অবধি মঠ খোলা থাকে ও অক্টবর থেকে মার্চ মাসে সকাল ৬:৩০ মিনিট থেকে বেলা ১১:৩০ ও বিকেল ৩:৩০ থেকে ৮:৩০ পর্যন্ত মঠখোলা থাকে।

কামারপুকুর (Kamarpukur) মঠ ও আশেপাশে কয়েকটি মন্দির সর্বত্রই শ্রী রামকৃষ্ণর স্মৃতি বিজড়িত সবটাই ঘুরে দেখার মত। পায়ে হেঁটে নাহলে টোটো ভাড়া করে ঘুরে দেখতে পারেন কামারপুকুর মঠ ও তার আসেপাশের অঞ্চল। হাওড়া স্টেশন থেকে গোঘাট কিংবা আরামবাগগামী লোকাল ট্রেন পৌঁছে দেবে গোঘাট। এখন থেকে গাড়ি বা অটোতে কামারপুকুর (Kamarpukur) মঠ দূরত্ব প্রায় আট কিমি। পঁচিশ টাকা ট্রেন ভাড়া। এছাড়ারাও ধর্মতলা থেকে সরকারি বসে চেপে তিন ঘন্টা যাওয়া যায় কামারপুকুর। এই মঠের প্রসাদ সর্বজন বিদিত। মন্দিরে প্রসাদ খেতে হলে অফিসঘর থেকে আগেই কুপন কেটে নিতে হবে। সাড়ে এগারোটা নাগাদ প্রসাদ বিতরণ শুরু হয়।

প্রসাদ খাওয়ার পর ঠাকুর রামকৃষ্ণর বসত বাড়ি ঘুরে দেখে নিন। কামারপুকুর প্রথমবার ঘুরতে গেলে গাইড নেওয়া ভাল। ঠাকুর যে জায়গায় জন্মে ছিলেন বর্তমানে সেই জায়গাতে পরমহংসের মন্দিরটি তৈরী করা হয়েছে। 

মন্দিরের পাশে ঠাকুরের হাতে নিজের হাতে লাগানো আম গাছটি ঠিক একইরকমভাবে বিদ্যমান। ঠাকুরের বসত বাড়ির উল্টোদিকে রয়েছে যুগি শিব মন্দির যেখানে দিব্য দৃষ্টিতে পরমহংসর বাংলার মাটিতে আগমন। অর্থাৎ গদাধর নামে জন্ম হয় বলে কথিত। মঠ প্রাঙ্গণ ঘোরা  হলে, ঘুরে দেখুন লাহা বাবুদের বিষ্ণু মন্দির। লাহাবাবুদের বাড়িকে কেন্দ্র করে রামকৃষ্ণর ছোটবেলাকার শিহরণ জাগানো নানা কাহিনী আজও যেন ফুলের মতো সতেজ।

লাহাবাবুরা কামারপুকুরের (Kamarpukur) জমিদার। তাদের প্রাচীন শিব মন্দিরটি তিন তলা। রামকৃষ্ণর বাবা এই লাহা বাবুদের বিষ্ণু মন্দিরে পূজারীর কাজ করতেন। ঠাকুরের মাত্ৰ পাঁচ বছর বয়সে বাবা তাকে নিয়ে চলে আসেন এই লাহা বাবুদের বাড়িতে। 

ঠাকুরের বাবা চাইতেন লাহাবাবুদের বাড়িতে পাঠশালাতে তিনি পড়াশুনা করুক।পাঠশালায় না গিয়ে, ঠাকুর লাহা বাবুদের বাড়ির পিছনে কালী মন্দিরে মায়ের পূজো ও ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। লাহাবাড়ির দুর্গা মন্দিরে ঐতিহ্যপূর্ণ এই পূজো শুরু ঠাকুর রামকৃষ্ণর আমল থেকে। এই জমিদার বাড়ির পূজোতে মা দুর্গার চক্ষুদান ঠাকুর নিজেহাতে করেছিলেন বলে কথিত আছে। 

ঠাকুরের দিব্বোন্মত্ত ভাব যখন গ্রামের মানুষের কাছে পাগলামি বলে মনে হয়েছিল,তার মা চন্দ্রামণি দেবী যোগেশ্বর শিব মন্দিরে হত্যে দিয়ে পরে ছিলেন। তাতে ঠাকুরের ভক্তিভাব এতটুকুও কমেনি। বরঞ্চ ধীরে ধীরে গদাধর (ওরফে ঠাকুর) ওপর ভক্তি, ভাবাবেগ ও সরলতায় কামারপুকুর বাসির মন ভক্তিরসে ভোরে ওঠে।

শ্রীধাম পেরিয়ে এরপর যেতে হবে শ্রীমায়ের পুণ্যভূমি জয়রামবাটিতে (Jayrambati)। দূরত্ব মাইল চারেক। যেন বৈকুন্ঠ থেকে লক্ষী এলেন জয়রামবাটীতে (Jayrambati)। গ্রামখানি যেন ধন্য হল মায়ের চরণ ধূলিতে। মায়ের পুণ্যভূমি যেতে হলে কলকাতা থেকে গাড়িতে দ্বিতীয় হুগলী সেতু ধরে সোজা আরামবাগ।

ট্রেন কিংবা সরকারি বাসেও যাওয়া যায় জয়রামবাটী (Jayrambati)। এখন থেকে রাস্তা দুভাগ হয়ে গিয়েছে। বাম দিকের রাস্তা ধরে একেবারেই সবুজের রাজ্যে প্রবেশ। রাস্তায় যেতে চোখে পরবে রাস্তার ধারে শুকতে দেওয়া ধান, পুকুর ভর্তি হাঁস শহুরে আমেজ ভুলিয়ে পৌঁছে দিল এ এক অন্য জগতে। 

বাঁকুড়া জেলার অন্তর্গত একটি ছোট গ্রাম জয়রামবাটি (Jayrambati) অন্যান্য গ্রামের থেকে খুবই সমৃদ্ধ মায়ের জন্মস্থল। মায়ের জন্মের আগে সেখানে তেমন কোন প্রাচুর্যই ছিল না। জয়রামবাটির পথে সবুজ ফসল পর্যটকদের মন আরোও সতেজ করে তুলবে। আধুনিক সভ্যতার কেন্দ্রস্থল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জয়রামবাটি পৌঁছে মনে হবে যেন একটুকরো দেবভূমিতে প্রবেশ। 

মাতৃ মন্দিরে শ্রী সারদা মায়ের আরতি শুরু হয় ভোর সাড়ে চারটে। পবিত্র শঙ্খ ধোনি নিয়ে শুরু হয় মায়ের আরতি। অত ভোরে ভক্তদের ভিড়ে উবছে ওঠে মায়ের মন্দির। শ্রী মায়ের বাবা রামচন্দ্র মুখার্জি ভিটে বাড়ি জায়গাতে অর্থাৎ মায়ের জন্ম স্থলে মন্দিরটি তৈরী হয়। মা ন বছর বয়স পর্যন্ত এই বাড়িতেই ছিলেন। শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ সঙ্গে তার এই বাড়িতে বিবাহ হয়। এই বাড়িতে রয়েছে মায়ের আঁতুড় ঘর। 

১৯২৩ সালে ১৯ এপ্রিল অক্ষয় তৃতীয়ার পুন্য তিথিতে মায়ের মন্দিরটি তৈরী হয়। মায়ের শ্বেতপাথরে মূর্তি ১৯৫৩ সালে বসন্ত পঞ্চমীর শুভ দিনে স্থাপিত হয়। এই মন্দির প্রাঙ্গনের মধ্যে মুখার্জি পরিবারের প্রাচীন দেবালয় ঘুরে দেখতে পারেন দেবালয়ের পাশে রয়েছে মায়ের স্মৃতি বিজড়িত পুন্য পুকুর। এই পুকুরের জল মা ব্যবহার করতেন।

মায়ের পুরনো বাড়ি যেন ঠিক  আগের মতো অবিকল ধরা রয়েছে। মায়ের ঘরে দালানে বসে মায়ের সেই বিখ্যাত ছবিটি তোলা হয়েছিল। যেখানে বসে মায়ের ছবিটি তোলা হয় সেখানে এখনো আলপনা আঁকা রয়েছে। এখানে মায়ের পাগলী মামী ঘর আছে। রয়েছে শ্যামাসুন্দরী ঘর। যেখানে মা রান্না করতেন সেটিও সুন্দর করে সাজানো রয়েছে। 

ভক্তদের নিজের হাতে রান্না করে মা যে খেতে দিতেন এই রান্না ঘরের দালানে। তা মায়ের আশ্রমে নিযুক্ত  স্বামীজির মুখ থেকে শ্রী মায়ের কাহিনী জেনে নিতে পারেন পর্যটকরা। আশ্রমের এক স্বামীজির মুখে মায়ের জীবনের নানা ঘটনা শোনা, যেমন ভাইদের সঙ্গে থাকতেন শ্রী মা। সেখান ভক্তদের সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকে। 

এ দেখে এক টুকরো জমি কিনে শ্রী স্বামী সারদানন্দ মায়ের জন্য নতুন বাড়ি করে দেন। সেখানে তিনি  চার বছর থাকেন। এই নতুন বাড়িতে মায়ের হাতে গোড়া নতুন জগদ্ধাত্রী মূর্তি বিদ্যমান। 

সারদা মায়ের নতুন বাড়ি পাশে এখনো রয়েছে জগদ্ধাত্রী মন্ডপ। মায়ের জন্ম স্থলে গেলে স্বামীজির মুখেও এই সব কথা জানা যাবে। মায়ের বাড়ি থেকে যেতে হয় সিংহ বাহিনীর মন্দিরে। এই মন্দিরের সঙ্গে নাকি মায়ের আত্মার সম্পর্ক ছিল। মন্দিরের মাটি আজও সাধারণ মানুষের সঞ্জীবনীর কাজ করে বলে গ্রামবাসীর মুখে প্রচলিত। জয়রামবাটী (Jayrambati) সর্বত্রই শ্রী মায়ের স্মৃতি। শ্রী মায়ের পুণ্যভূমি ছেড়ে এবার ব্যাগ গুছিয়ে রওনার পালা। মন খারাপের মধ্যেই কলকাতার (Kolkata) পথে ফেরা। কারণ ফিরতে যে হবেই!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here