জায়গাটার কথা যাওয়ার এক মাস আগেও জানতাম না। এমনকী কোনও ভ্রমণের বইয়েও পড়েছি বলে মনে পড়ছে না। ঠিক ছিল, ফেব্রুয়ারিতে কালিম্পং (Kalimpong) লাগোয়া দু একটা জায়গায় যাব। কোথায় যাবো, সেটা না হয় পরে ঠিক করা যাবে। তার আগে এনজেপি (New Jalpaiguri) পর্যন্ত ট্রেনের টিকিট তো কাটা থাক। এমনকী, ফেরার টিকিটটাও কনফার্ম থাকলে ভাল হয়। মোটামুটি এটাই আমাদের বেড়াতে যাওয়ার ফর্মুলা। আগে যাওয়া–‌আসার টিকিট কেটে নাও। তারপর না হয় মাথা গোঁজার ঠাঁই খোঁজা যাবে। সেই ভেবেই যাওয়া–‌আসার টিকিট কাটা হল। এবার না হয় ঠিক করা যাবে, কোথায় যাব।

এনজেপি টিকিট কাটা মানে, একসঙ্গে অনেক বিকল্প তৈরি রাখা। চাইলে দার্জিলিঙের (Darjeeling) দিকে যাওয়া যায়। কার্শিয়াং (Kurseong) লাগোয়া বিভিন্ন সুন্দর জায়গা তো আছেই। চাইলে কালিম্পঙের দিকে যাওয়া যায়। সিকিমের (Sikkim) দরজা তো খোলাই আছে। সেইসঙ্গে যদি মন পাহাড়ের ডাকে সাড়া না দিয়ে অরণ্যে ঝুঁকতে চায়, তাহলে ডুয়ার্সও (Dooars) রইল। অন্য সব দিকটায় আমার গিন্নির একাধিকবার ঘোরা আছে। একমাত্র কালিম্পঙের (Kalimpong) দিকটায় তার যাওয়া হয়নি। তাই মনে হল, এবার ওদিকেই পাড়ি দেওয়া যাক।

আগে ছিল ভ্রমণের বই। এখন তো youtube আছে। সহজেই ইচ্ছেমতো জায়গা দেখে নেওয়া যায়। সেখানেই ফোন নম্বর থেকে শুরু করে নানা তথ্য পাওয়া যায়। সেইসঙ্গে সবথেকে বড় পাওনা, একটা খুঁজতে গিয়ে আরও অনেক অজানা জায়গার হদিশ পাওয়া যায়। সেভাবেই পাওয়া গেল মুঙ্গেরজং (mangarjung)। ভিডিওতে আমি যা দেখব, গিন্নিও তাই দেখবে। অতএব, রিসার্চের ভারটা তার ওপর ছেড়ে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। অন্তত ভাল না লাগলে সেখানে গিয়ে গালাগাল খাওয়ার ঝুঁকিটা থাকছে না।

কয়েকটা ভিডিও দেখে মন্দ লাগল না। কালিম্পং থেকে ঘণ্টা দেড়েক। মনসুং থেকে আরও কিছুটা এগিয়ে গেলেই এই মুঙ্গেরজং (mangarjung)। সেখানেই বসন্ত তামাংয়ের হোম স্টে। তিস্তা রিভার ভিউ। কালিম্পং থেকে যাওয়ার পথে একবার ডেলো (Deolo) ছুঁয়ে গেলে মন্দ হয় না। ড্রাইভার সাহেবকে একবার বলতেই তিনি রাজি। ডেলোতে আধঘণ্টা কাটিয়ে চললাম মনসুংয়ের (Munsong) দিকে। মনসুং (Munsong) তো এলাম। এবার কোনদিকে। বসন্তজিকে বারবার ফোন লাগাচ্ছি। তিনি থোড়া নসদিক, থোড়া নসদিক বলে চলেছেন। নানারকম রুট ডিরেকশন দিচ্ছেন। এসব বোঝা বাপু আমাদের কম্ম নয়। ড্রাইভার সাহেবকেই ফোনটা ধরিয়ে দিলাম। নেপালি ভাষায় তাদের কথাবার্তা চলল। যার কিছুটা আমরা বুঝলাম। বাকিটা না বুঝলেও অনুমান করে নিলাম। 

তাছাড়া, আমাদের বেশি বুঝে কাজ নেই। ড্রাইভার সাহেব বুঝলেই হল। গাড়ি ফের এগোতে লাগল। এবার বুঝলাম, ড্রাইভার সাহেবও কিছুই বোঝেননি। হাঁতড়ে চলেছেন। এদিকে, বসন্তজির ফোন মাঝে মাঝেই নট রিচেবল। মহা ঝামেলা তো!‌ এতদূর এসে ফিরে যেতে হবে!‌ শেষমেষ একে তাকে জিজ্ঞেস করে ডেরায় পৌঁছে গেলাম।

মনে হচ্ছিল, এমন দুর্গম জানলে কে আসত!‌ ড্রাইভার সাহেবও বলে উঠলেন, কে এই জায়গার সন্ধান দিয়েছে!‌ আর জায়গা খুঁজে পেলেন না!‌ কত ভাল ভাল জায়গা ছিল।

কিন্তু একটু পরেই ভুল ভাঙল। গাড়ির আওয়াজ শুনেই বসন্তজি বেরিয়ে এলেন। নিষ্পাপ হাসি মাখানো মুখ। এমনিতেই পাহাড়ে গেলে রাগ কমে যায়। তবু যেটুকু বিরক্তি ছিল, সেটাও যেন ওই হাসিমুখটা দেখে উধাও হয়ে গেল। কিছু বলার আগেই বসন্তজি বলে উঠলেন, ‘‌আপলোগোকো আনেমে বহত তকলিফ হুয়া। উসকে লিয়ে মাফি চাতা হুঁ।’ বলুন তো, এরপর আর রাগ করা যায়!‌ তাছাড়া, উনি তো আর ঘাড় ধরে আমাদের টেনে আনেননি। আমরা ভিডিও দেখেছিলাম, ভাল লেগেছিল। ফোনে কথা বলেছিলাম। তিনিও বলেছিলেন পৌনে দু ঘণ্টার মতো লাগবে। 

এতে তো তাঁর কোনও দোষ নেই। এরপর বসন্তজি নিয়ে গেলেন ঘরের দিকে। কে জানত, এমন চমক অপেক্ষা করে আছে!‌ ঢালু হয়ে নেমে গেছে পাহাড়টা। নিচে তাকালেই দেখা যাচ্ছে তিস্তার নীল জল। মনে পড়ে গেল শ্রীকান্তর সেই গানটা— মন খারাপ হলে কুয়াশা হয়, ব্যাকূল হলে তিস্তা। বারান্দা থেকে এই দৃশ্য দেখলে যে কোনও মানুষের মন ভাল হয়ে যেতে বাধ্য। এতটা পথ পেরিয়ে আসার ক্লান্তিটা যেন নিমেশেই তিস্তার জলে ভেসে গেছে। ড্রাইভার সাহেবও বেশ খুশি। বলেই উঠলেন, ‘‌এতদিন গাড়ি চালাচ্ছি। এমন জায়গার কথা জানতাম না তো। নাহ, আপনারা ঠিক জায়গাই বেছেছিলেন। এবার অন্য ট্যুরিস্টদের এই জায়গায় আনাই যায়।’ চলে যাওয়ার আগে বসন্তজির কাছ থেকে কার্ড নিয়ে গেলেন। ‌ ‌

দুপুর হয়ে গিয়েছিল। পেটে খিদের সাইরেন বেজে উঠছে। দ্রুত স্নান সেরে মধ্যাহ্নভোজে। খাওয়ার জায়গাটা দেখলে মুগ্ধতা আরও বেড়ে যাবে। সামনে একটা আলাদা চালা ঘর। সুন্দরভাবে সাজানো। পাহাড়ের হোম স্টে মানে দিনের বেলায় ডিম, রাতে চিকেন। এটা মোটামুটি কমন। কিন্তু রান্নার গুণে সেই ডিমের ঝোল শহুরে চিকেনকে দশ গোল দিতে পারে। 

এমনিতেই খিদের পেটে সবকিছুই সুস্বাদু লাগে। তার ওপর সত্যিকারের যদি সুস্বাদু হয়, তাহলে তো কথাই নেই। খাওয়া দাওয়া সেরে নরম রোদ গায়ে মেখে তিস্তার দিকে মুখ করে বসে থাকা। অনেকটা নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে এই তিস্তা। অনন্তকাল এখানে বসে থাকা যায়। বসার দারুণ বন্দোবস্তও করে রেখেছেন বসন্তটি। কোথাও বেঞ্চ পাতা। কোথাও আবার বাঁশ দিয়ে বেঞ্চ বানানো। আর একটু দূরে বানিয়ে ফেলেছেন আস্ত ভিউ পয়েন্ট। সেখান থেকে তিস্তার এঁকে বেঁকে যাওয়া গতিপথ অনেকটা দেখা যায়।

শহুরে জীবনে কতদিন নির্মল, স্নিগ্ধ বিকেল দেখিনি। এমন নির্ভেজাল পাহাড়ি গ্রামে প্রাণ ভরে সেই বিকেলের স্বাদ নেওয়া। চড়াই উতরাই পথে অনেকটা হেঁটে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সন্ধে নামতে তো দেরি নেই। তাই ফিরে আসাই ভাল। অ্যাডভেঞ্চার না হয় সকালের জন্য তোলা থাক। এরই মাঝে বেশ কয়েকটা গাছে ময়ূর ডাকতে শুরু করেছে। এক গাছ থেকে অন্য গাছে ময়ূর দিব্যি উড়ে যাচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে, বেশ কয়েকটা গাছেই ময়ূর ডেরা বেঁধেছে। পাহাড়বাসীর কাছে এটা হয়ত কিছুই না। আমরা যেমন কাক দেখতে অভ্যস্থ, এঁরা সেভাবেই রোজ ময়ূর দেখেন। কিন্তু আমাদের কাছে এই ময়ূরের ডাকের একটা আলাদা রোমাঞ্চ তো আছেই।  

এমনিতেই পাহাড়ে রাত মানে তেমন কিছু করার থাকে না। এই সময় ফোনে গল্প করতেও ইচ্ছে করে না। ঠান্ডায় বেশিক্ষণ বাইরে বসে থাকাও যায় না। কিছুক্ষণ ডাউনলোড করে সিনেমা দেখা, কিছুক্ষণ গল্প করা। আর মাঝে মাঝে বাইরে একটু উকি দেওয়া। দূরের পাহাড়ের আলোগুলো একে একে জ্বলে উঠছে। সব তারা যেন মাটিতে নেমে এসেছে। পাহাড়ে রাতে খাওয়ার পর্ব একটু তাড়াতাড়ি চুকিয়ে ফেলতে হয়। নটা মানে, এখানে অনেক রাত। ওঁরা খুব তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েন। আমাদের কু অভ্যাসের জন্য তাঁদের জাগিয়ে রাখার মানে হয় না।

পরেরদিন সকালে উঠেই মনে হল, এবার টুকটাক অ্যাডভেঞ্চার চলতে পারে। মধ্যবিত্তের আটপৌরে অ্যাডভেঞ্চার মানে, কিছুটা পায়ে হেঁটে ঘুরে আসা। কোনও নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই। পথ যেদিকে নিয়ে যাবে।
এভাবেই যেতে যেতে কখনও বাচ্চাদের সঙ্গে আড্ডা দিতে শুরু করলাম। আবার হাঁটতে হাঁটতে একটা উঠোনে দেখলাম, একটা বাচ্চা মেয়ে পড়ছে। মনে হল, একটু গল্প করে আসা যাক। কোথাও কোনও জড়তা কাজ করছে না। পুরো গ্রামটাই যেন নিজেদের গ্রাম মনে হচ্ছে। বাড়ির উঠোনে ঢুকতেই ওঁরাও চাটাই পেতে দিলেন। একজন পুঁচকে তো একটা বেতের মোড়া এনে হাজির। ওদের আবদারে আরেক প্রস্থ চা হয়ে গেল। হালকা রোদ উঠছে, সেই রোদ গায়ে মেখে অন্যের দাওয়ায় আড্ডা দিতে মন্দ লাগছে না। খোলামেলা আড্ডায় পাহাড়কে যেন নতুন করে চিনছি।

মাঝে মাঝেই এখানে সেখানে একটু বসে পড়া। তেষ্টা পেলে নির্দ্বিধায় লোকের বাড়িতে ঢুকে জল চাওয়া। ফেরার পথে আবার সেই বাচ্চাদের সঙ্গে দেখা। ওরা কেউ গান করল, কেউ নাচ করল। কেউ বাড়ি থেকে কী একটা ফল এনে দিল। এমন নিখাদ আন্তরিকতা কোথায় পাবেন!‌

বসন্তজির ডেরায় ফিরে মনে হল, এই পাহাড়ের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে চেনা মানুষদের চিঠি লিখলে কেমন হয়!‌ কাগজ–‌পেন সঙ্গেই ছিল। লেখাও শুরু। গিন্নি লিখল তার চেনাজানা লোকেদের। আমি লিখলাম আমার চেনাজানা লোকেদের। সবার ঠিকঠাক পোস্টাল অ্যাড্রেস হয়ত জানি না। পিন কোডও জানি না। কোথায় পোস্ট হবে, তাও জানি না। কিন্তু লিখতে তো বাধা নেই। পরে না হয় ঠিকানা জেনে নেওয়া যাবে। ফেরার পথে কালিম্পঙে পোস্ট হতে পারে। তাও যদি না হয়, কলকাতা ফিরেও না হয় পোস্ট হতে পারে।

কখনও চিঠি লিখে, কখনও পায়ে হেঁটে গ্রাম ঘুরে, কখনও অলস রোদ গায়ে মেখে তিস্তার দিকে চেয়ে থেকে। এভাবেই দ্বিতীয় দিনটাও সুন্দর কেটে গেল। পরেরদিন ফেরার পালা। ফেরার দিন মানেই মন কেমন। তবে সরাসরি সমতল নয়, আরও একটা দিন, পাহাড়েরই অন্য কোনও ঠিকানায়। শীত পেরিয়ে বসন্তও যাই যাই। 

এ কেমন বসন্ত, যেখানে বাতাসে এমন ভয়ের সুর। ঘরবন্দি মহানগরে বারবার মন ফিরে যাচ্ছে সেই শান্ত পাহাড়ে। যেখানে টিভি চ্যানেলের ব্রেকিং নিউজ নেই। আতঙ্কের সংক্রমণ নেই। যেখানে আপন মনে ময়ূর ডেকে চলেছে। যেখানে পায়ে পায়ে জঙ্গল পেরিয়ে অনেকটা পথ হেঁটে যাওয়া যায়। যেখানে পায়ের তলা দিয়ে বয়ে চলেছে তিস্তা। মুঙ্গেরজং, এই অস্থির সময়ে তোমার স্নিগ্ধতা অনেকটাই ভরসা দিতে পারত।  ‌

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here