ভ্রমণ পিপাসু বাঙালি সারা বছরে ছুটির ফাঁদে পা গলিয়ে ফেললেই মন তার উড়ু উড়ু করে ওঠে। ব্যাগপত্তর গুটিয়ে গুটি গুটি পা’য়ে বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু কোথায় যাবেন তা ভেবে কুল কিনারা পান না। অথচ, কাছে পিঠে যেখানেই যাওয়ার সুযোগ ঘটে বাঙালি পর্যটকদের ভিড়ে সরগরম হয়ে ওঠে সেই স্থান। তাহলে যাবেন কোথায়! আমকে প্রশ্ন করলে বলব, প্রশ্নটা তো সোজা আর উত্তরও তো জানা – শিমুলতলা, বিহার!

বেশি দূরেও নয়! আবার খুব কাছেও নয়! এক রাতের ট্রেন যাত্রা। হাওড়া স্টেশন থেকে প্রতিদিন রাত্রি ১১.১০ মিনিটে ছাড়ে মোকামা প্যাসেঞ্জার ট্রেন। পরের দিন সকাল ৭টা ৩০মিনিটে পৌঁছে দেবে শিমুলতলা স্টেশন। এছাড়া হাওড়া থেকে দিল্লিগামী বহু ট্রেন রয়েছে। আর যদি হাওড়া স্টেশন থেকে জসিডি পর্যন্ত ট্রেনে আসেন, তাহলে জসিডি জংশন থেকে ট্রেন বদল করতে হবে। মেমু ট্রেন(লোকাল ট্রেন)ধরে শিমুলতলা নামতে হবে।

বাঙালিরা হাওয়া বদলের জন্য প্রায়শই পশ্চিমে যেত চিকিৎসকদের পরামর্শে। শরীরে রোগ বাসা বাঁধলেই পশ্চিমে যেতে হবে হাওয়া বদলের জন্য এমনটা মোটেও নয়। যন্ত্র সভ্যতার জাঁতাকলে ঘষা খেতে খেতে হাঁপিয়ে ওঠার ঠিক আগে নিজেকে সতেজ আর প্রাণবন্ত করে তোলার সবথেকে সেরা উপায় ব্যাগপত্তর গুটিয়ে বেরিয়ে পড়া। আর বেরিয়ে পড়লে একবার শিমুলতলায় পা রাখা।

শিমুলতলায় পৌঁছে কী দেখবেনঃ

লাট্টু পাহাড়, রাজবাড়ি, হলদি ঝর্ণা, ধারারা ফলস। আর তার সঙ্গে দিগন্ত বিস্তৃত খোলা আকাশ! যার তলায় দাঁড়িয়ে আপনি প্রতি মুহূর্তে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যকে দু’ চোখ মেলে ধরে রাখতে পারবেন আজীবন মনের মণিকোঠায়। মুক্ত আকাশের তলায় দাঁড়িয়ে বাধাহীন ফুরফুরে বাতাসের স্পর্শে আপনার শরীর আর মন আরও সবুজ হয়ে উঠবে। প্রকৃতি তার অপার সৌন্দর্য দুহাত দিয়ে উজাড় করে মেলে ধরেছে শিমুলতলায়।

থাকবেন কোথায়ঃ

শিমুলতলা স্টেশনে নেমে ডানদিকে বাসস্ট্যান্ড আর বাজার রয়েছে। বাজারের ডানদিক বরাবর প্রচুর বাংলো বাড়ি রয়েছে। রয়েছে আধুনিক মানের হোটেল। আর রয়েছে তারা মঠ। থাকতেই পারেন এই সব জায়গায়।

টানা এক সপ্তাহ ছুটি পেলে তো কথাই নেই। আগে হলে বলতাম, বড়দিনের সপ্তাহটা পুরোমাত্রায় ব্যবহার করার এটাই সেরা সুযোগ। বড়দিন চলে গেছে, তাই বলছি, দোলের আগে পরে চার পাঁচ দিন সুযোগ পেলে ঘুরে আসতে পারেন। শিমুলতলা বাজার থেকে মাছ কিনে রান্না করে খেতে পারেন। আর নয়তো বাংলো বাড়িতে রাঁধুনির ব্যাবস্থাও করে নিতে পারেন। তবে হ্যাঁ, গরম জামা কাপড় অবশ্যই নিয়ে যাবেন। কেননা, শিমুলতলায় বেশ ভালই ঠান্ডা পড়ে। আর এই ঠান্ডাটাও বেশ উপভোগ্য। বাজারেই ডেকরের্টার্স রয়েছে। কম্বল, তোষক, বালিশ এবং হ্যাজাকের কোনও অসুবিধা হবে না। ভাড়া পাওয়া যায়। হ্যাজাকের কথা এই কারণেই উল্লেখ করা হল সন্ধ্যের সময় শিমুলতলাতে বিদ্যুতের সমস্যা রয়েছে। বিশেষত ‘লো ভোল্টেজ’। সে জন্যই হ্যাজাকের ব্যাবস্থা রাখা ভাল। আর সঙ্গে অবশ্যই টর্চ নিয়ে যাবেন। শিমুলতলায় পা রাখবেন আর স্থানীয় মিষ্টির স্বাদ চেখে দেখবেন না তা কি হয়। সকাল-বিকাল দু’বেলা গরম সিঙ্গাড়া আপনি পাবেনই। এছাড়া সঙ্গে রয়েছে রসগোল্লা, সন্দেশের মধ্যে কালাকাদ, ল্যাংচা, বোঁদে, নিমকি, গাঠিয়া আর চানামুড়কি।

শিমুলতলায় পৌঁছে একটা অটো ভাড়া করে নেবেন। আর তারপর বেরিয়ে পড়বেন লাটু পাহাড়, রাজবাড়ির উদ্দেশ্যে। একদিনেই অটো চেপে শিমুলতলা ঘুরে বেড়াতে পারবেন। পরের দিন ভাগলপুরগামী বাসে উঠে পড়বেন। প্রকৃতির কান ঘেঁষে দু’চোখ মেলে নয়নাভিরাম সৌন্দর্যকে পরতে পরতে উপভোগ করবেন। আর ফিরতি বাসেই ভাগলপুর থেকে আবার শিমুলতলায় চলে আসবেন। তবে ভাগলপুর বেড়াতে গেলে অবশ্যই ভোরবেলা উঠতে হবে। কনকনে ঠান্ডায় যাওয়ার জন্য নিজেকে তৈরি করে নিতে হবে। সন্ধ্যার সময় শিমুলতলা স্টেশন রোডে ঘুরতেই পারেন। শিমুলতলা বাজার থেকে লাট্টু পাহাড় হাঁটা পথে ১৫ মিনিট। তবে সন্ধ্যার সময় লাট্টু পাহাড়ের দিকে যাবেন না। রাস্তা অনেক সরু এবং নির্জন, সেইসঙ্গে অন্ধকার। কোনও এক সময় শিমুলতলা মাওবাদি অধ্যুষিত জায়গা ছিল। এখন রাজনৈতিক পরিবেশ শান্ত। তবে কেন্দ্রীয় বাহিনীর টহলদারি এখনও নিয়মিত জারি আছে।

শিমুলতলা থেকে আপনি একদিনের জন্য ঝাঁ ঝাঁ ঘুরে আসতেই পারেন। শিমুলতলা থেকে মেমু ট্রেন  (লোকাল ট্রেন) ধরে ঝাঁ ঝাঁ স্টেশনে নামলেন। একটু বিশ্রাম নিয়ে ফিরতি ট্রেন ধরে আবার শিমুলতলায় চলে আসলেন। শিমুলতলা থেকে ট্রেনে ঝাঁ ঝাঁতে হবে।ঠঠঠ স্টেশন পর্যন্ত যাত্রা পথ এতটাই সুন্দর যা আপনি শহরে বসে কল্পনাই করতে পারবেন না। শিমুলতলা বাঙ্গালিদের কাছে বিখ্যাত আরও একটি কারণে। জনপ্রিয় বাংলা চলচ্চিত্র ‘দাদার কীর্তি’র শ্যুটিং এর সেট পড়েছিল এই শিমুলতলায়। তাই আর দেরি নয়। শিমুলতলায় যাওয়ার প্রস্তুতি এখন থেকেই সেরে নিন।     

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here